বুদ্ধিজীবীরা আজও অনুপ্রেরণা হয়ে আছেন

  • ১৫-Dec-২০১৯ ০৪:৪৮ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

আজ বিজয়ের দিন। লাল-সবুজের এই দিনে ‘সবক’টা জানালা খুলে দাও না/আমি গাইবো, গাইবো বিজয়েরই গান।/ওরা আসবে চুপি চুপি/যারা এই দেশটাকে ভালোবেসে দিয়ে গেছে প্রাণ/চোখ থেকে মুছে ফেল অশ্রুটুকু/এমন খুশির দিনে কাঁদতে নেই।’ নিউরণে জেগে ওঠা স্মৃতির নাড়ায় যারা বুলেট-বোমার স্প্লিনটার ধারণ করে আজও অশ্রুভেজা চোখে এই দিনটিতে প্রজ্জ্বলিত হয়ে ওঠেন, তাদের কাছে গিয়ে অপেক্ষা করলেই বিজয়ের মূল প্রতীক্ষার অংশগুলো জ্বল জ্বল করে ওঠে। যেখানে স্বপ্নজোড়া দিগন্তে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘সোনার বাংলা’ রয়েছে। সে ধারায় আমরা আজ অনেকটাই সফল। যদিও দিন লেগে গেছে অনেক। যদিও পুরোটা অর্জনে আসেনি মানুষের মুখোশে ঢাকা স্বাধীনতার চেতনাবিরোধীদের জন্য। হন্যে হয়ে তাই আজও চোখ মেলে বসে থাকতে হয় সাফল্যের পথে আর কোন ষড়যন্ত্র চলছে কিনা দেখতে। 

আমাদের সবচেয়ে প্রিয় বিজয় দিবস ১৬ ডিসেম্বর। একাত্তরের এই দিনে বিশ্বাসঘাতক পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাদের ভুল অহঙ্কারের কঠিন ফলাফল দেখেছিল বাংলাদেশের দামাল ছেলে, মেয়ে, নারী, বৃদ্ধদের চোখে-মুখে। হার মেনে দেশ ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল তারা। যদিও ততোদিনে বাংলার মাটি, রাজপথ, নদীতে বইয়ে দিয়েছিল রক্তের স্রোত, খালি করেছিল মায়ের কোল, লুটে নিয়েছিল লাখ লাখ নারীর সম্ভ্রম। তারপরও আমরা বারবার গীতিকার নজরুল ইসলাম বাবুর কথায় ফিরে যায়, ‘চোখ থেকে মুছে ফেল অশ্রুটুকু/এমন খুশির দিনে কাঁদতে নেই।’

বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের পর বাংলার স্বাধীনতা সূর্য অস্তমিত হয়। দীর্ঘ প্রায় দুইশ বছর ব্রিটিশ বেনিয়া আমাদের ভারতবর্ষকে শাসন-শোষণ করে। ১৯৪৭ সালে ‘ভারত স্বাধীন আইন’র মাধ্যমে বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান ও ভারতবর্ষ নামে দুটি দেশের জন্ম হয়। তারপর থেকেই পাকিস্তানের অংশ পূর্ব পাকিস্তান যা আজকের বাংলাদেশ নানাভাবে পাকিস্তানি শাসক দ্বারা শোষিত হচ্ছিল। অত্যাচার, অনাচার, জুলুম, নির্যাতনের বিরুদ্ধে, অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য, বাংলা ভাষার জন্য ৪৭’র পরপরই আন্দোলন দানা বেধে ওঠে। ১৯৪৮ সালে জিন্নাহ পূর্ব পাকিস্তান সফরের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার জন্য স্মারকলিপি দেয়। তখন থেকে রাষ্ট্রভাষা বাংলার আন্দোলন শুরু। ১৯৫২ সালে ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনে সালাম, রফিক, জব্বার, প্রাণ দিয়ে প্রমাণ করেছেন রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই। ভাষা আন্দোলন পর ১৯৬৯ সালে আইয়ুব খান বিরোধী গণঅভ্যুত্থান আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নেয়। ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান পর ৭০ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচন আসে। নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৬ দফা পূর্ব বাংলার মানুষ মনেপ্রাণে গ্রহণ করে।

সারা পাকিস্তানে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। কাজেই স্বাভাবিকভাবে বঙ্গবন্ধু সরকার গঠন করে পাকিস্তান শাসন করবেন। কিন্তু সেনা শাসক ইয়াহিয়া খান তা করতে দিলেন না। বঙ্গবন্ধু আন্দোলন অব্যাহত রাখলেন। ক্ষমতা হস্তান্তর না করে ভুট্টোর সঙ্গে আতাত করে ইয়াহিয়া খান পূর্ব বাংলার ওপর ২৫ মার্চ কালো রাতে হত্যা-নির্যাতন শুরু করে। কিন্তু তার আগেই ৭ মার্চ ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানে তার অমর ভাষণে জাতিকে নির্দেশনা দিয়ে স্বাধীনতার পথকে সুগম করেন। আর তাই ১৯৭১ সালে ২৫ মার্চ আন্দোলনকারী বাংলার মানুষের উপর লেলিয়ে দেওয়া পাকিস্তানি বাহিনীর হত্যাযজ্ঞের পর বঙ্গবন্ধুর সেই আহ্বান ‘যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে’ ঝাপিয়ে পড়ে বাংলার দামাল ছেলেরা। তাদের কর্ণকুহরে সব সময় ছিল বঙ্গবন্ধুর সেই বাণী ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতার যুদ্ধ। বাংলার প্রতিটি মুক্তিযোদ্ধারের একটাই তখন লক্ষ দেশকে স্বাধীন করা। তাদের কথা গানে গানে উঠে আসে, গীতিকার গোবিন্দ হালদার লেখেন, ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি, মোরা একটি ফুলের হাসির জন্য অস্ত্র ধরি।’

১৯৭১ সালে ২৫ মার্চের পর থেকে মাত্র ৯ মাসে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশকে স্বাধীনতার দুয়ারে নিয়ে উপনীত হয়। মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে ভারতীয় বাহিনীর সার্বিক সহযোগিতায় আমাদের মুক্তি সংগ্রাম সফলতা লাভ করে। লক্ষ শহীদের প্রাণের বিনিময়ে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে আমরা আমাদের বিজয় পতাকা ছিনিয়ে নিতে সক্ষম হই। তাই ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস। এর আগে বাংলাদেশে তারা আর থাকতে পারছে না জেনে ১০ থেকে ১৪ ডিসেম্বরের মধ্যে আল-বদর বাহিনী অনেক বুদ্ধিজীবীকে ধরে নিয়ে মোহাম্মদপুর ফিজিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে স্থাপিত আল-বদর ঘাঁটিতে নির্যাতনের পর রায়েরবাজার বধ্যভূমি ও মিরপুর কবরস্থানে নিয়ে হত্যা করে। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে রয়েছেন অধ্যাপক মুনির চৌধুরী, ডা. আলিম চৌধুরী, অধ্যাপক মুনিরুজ্জামান, ড. ফজলে রাব্বী, সিরাজ উদ্দিন হোসেন, শহীদুল্লাহ কায়সার, অধ্যাপক জিসি দেব, জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা, অধ্যাপক সন্তোষ ভট্টাচার্য, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, সাংবাদিক খন্দকার আবু তাহের, নিজামউদ্দিন আহমেদ, এসএ মান্নান (লাডু ভাই), এ এন এম গোলাম মোস্তফা, সৈয়দ নাজমুল হক, সেলিনা পারভিনসহ আরো অনেকে। তারা আমাদের স্বাধীন দেশে এখনো এগিয়ে চলার অনুপ্রেরণা।

বিজয় দিবস আসলে আমাদের ভাবনা মনের হৃদয়ে উঁকি দিতে থাকে। আমরা আবারও নতুন উদ্যোমে জেগে উঠি। স্বাধীনতার চেতনায় উদ্ভাসিত হই। এই দিন আমাদেরকে দেশ এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয়ে কয়েকগুণ শক্তির যোগান দেয়। আমরা সজীব হয়ে উঠি। আর তাই বঙ্গবন্ধুকন্যার সুপরিকল্পিত ও সুচারু পরিচালনায় বাংলাদেশ এখন মধ্যম আয়ের দেশে উপনীত। আমরা এগিয়ে যাচ্ছি বিদ্যুৎগতিতে। দেশ এখন বিভিন্ন খাতে উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন স্তরে বিশ্বের দরবারে রোল মডেলে পরিণত হয়েছে। দেশ থেকে গুম, খুন, গুপ্তহত্যা বিদায় নিয়েছে। খুব দ্রুতই আমরা বঙ্গবন্ধুর সেই ‘সোনার বাংলা’ পেতে যাচ্ছি। 

Ads
Ads