বঙ্গবন্ধুকন্যার হাতেই দেশ হবে দারিদ্র্যমুক্ত

  • ১৮-Dec-২০১৯ ০৫:৪২ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

গেল বছরের জুন থেকে এ বছরের জুন পর্যন্ত দেশের দারিদ্র্যের হার ১ দশমিক ৩ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ২০ দশমিক ৫ শতাংশে। একই সময়ে দেশের অতি দারিদ্রের হারও দশমিক ৮ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ৫ শতাংশে। গত মঙ্গলবার বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এসব তথ্য তুলে ধরে সুখবর দেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। বঙ্গবন্ধুকন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের দারিদ্র্যবিমোচনী পদক্ষেপ খুব দ্রুতই আমাদেরকে সেই সুখবর দেবে যেখানে দেশে আর কোন দরিদ্র থাকবে না। প্রতিটি শ্রেণির মানুষই এখন পেট ভরে খেতে পারে। সেদিন আর দূরে নয়, যেখোনে অভাবে আর কোন মানুষকে মরতে হবে না। 

দেশের শ্রমিক, কৃষকসহ মেহনতি মানুষের অবদানের কারণে দারিদ্র্য কমেছে বলে মহতি মন্তব্যের কথা জানিয়েছেন আমাদের পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। তার বক্তব্য অনুযায়ী, দারিদ্র্যের হার আরও কমলে প্রধানমন্ত্রী আরো খুশি হতেন। আর আমরা বিশ^াস করি, বাংলার মেহনতি মানুষেরা এই পরিসংখ্যান পাওয়ার আগেই খুশি। কারণ তাদের দিন আগের মত কঠিন, কষ্টকর ও অভুক্ততায় কাটে না। 

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) আয় ও ব্যয় জরিপ (এইচআইইএস) ২০১৬-এর প্রাথমিক রিপোর্টে আমরা দেখেছিলাম, ২০০৬ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরের তুলনায় ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে জাতীয় পর্যায়ে দারিদ্র্য হ্রাসের গতি কমেছে। বিবিএসের তথ্য মোতাবেক, জাতীয় পর্যায়ে ২০০০ সালের ৪৮ দশমিক ৯ শতাংশ দারিদ্র্যের হার কমে ২০০৫ সালে দাঁড়ায় ৪০ শতাংশে। প্রতি বছর গড়ে দারিদ্র্য হ্রাসের হার ১ দশমিক ৭৮ শতাংশ। ২০১০ সালে দারিদ্র্যের হার কমে জাতীয় পর্যায়ে দাঁড়ায় ৩১ দশমিক ৫ শতাংশে। অর্থাৎ ২০০৫ পরবর্তী ৫ বছরে প্রতি বছর গড়ে দারিদ্র্য কমে ১ দশমিক ৭ শতাংশ হারে। সর্বশেষ ২০১৬ সালে জাতীয় পর্যায়ে দারিদ্র্যের হার দাঁড়িয়েছে ২৪ দশমিক ৩ শতাংশে। এতে ২০১০ পরবর্তী প্রতি বছর গড়ে দারিদ্র্য হ্রাসের হার ১ দশমিক ২ শতাংশ। 

দিনদিন দেশ থেকে দারিদ্র্য কমলেও গতি বেশ শ্লোথ বলে মনে করছেন অর্থনীতি ও সমাজতত্ত্ববিদরা। তাদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তি এবং দারিদ্র্য হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী কৃষিতে প্রবৃদ্ধির হার কমে গেছে। অন্যদিকে ২০১৫-১৬ সালে বিবিএসের কোয়ার্টার্লি লেবার ফোর্স সার্ভের তথ্য অনুযায়ী শ্রমশক্তির বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ২ শতাংশ ছিল। বর্তমানে এই হারের উন্নয়ন ঘটলেও শ্রমবাজারে প্রবেশের অপেক্ষায় থাকা যুবকদের বেকারত্ব এখনো মাথা ব্যাথার কারণ। অন্যদিকে মানুষের জীবনযাত্রায় ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ মানুষের আয়, বিশেষ করে শ্রমিকদের মজুরি বাড়লেও তা নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষের জন্য বলে মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, সার্বিকভাবে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মজুরি বাড়েনি। নির্মাণ ও শিল্প শ্রমিকের মজুরি বাড়লেও কৃষি শ্রমিকের মজুরি তেমন বাড়েনি। তাছাড়া, দিনকে দিন খাদ্যদ্রব্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বাড়ার তুলনায় নির্দিষ্ট আয়ের নিম্নবৃত্তের মানুষের আয় না বাড়ায় তারা ক্রমে দরিদ্র শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। এছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে নিম্নমধ্যম শ্রেণির মানুষসহ অনেকে দরিদ্র শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। দেশে প্রতিবছর নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাস, বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে বহু মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হচ্ছেন। সব কিছু হারিয়ে এরা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাতারে শামিল হচ্ছেন। এতে দারিদ্র্য কমলেও হার গিয়ে শ্লোথ গতিতে গিয়ে ঠেঁকছে। আবার সরকারের সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকলেও দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী জনগোষ্ঠী এখনো শিক্ষা ও সচেতনতার অভাবে ‘দারিদ্র্য চক্র’ থেকে বের হয়ে আসতে পারেনি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দরিদ্র পরিবারগুলো বংশপরম্পরায় দারিদ্র্য চক্রের মধ্যে আবর্তিত হতে থাকে। ফলে উল্লেখযোগ্য হারে কমেনি দরিদ্র মানুষের সংখ্যা।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দারিদ্র্যের হারকে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে সরকারে সব পদক্ষেপের পাশাপাশি আরও বেশি জোর দিতে হবে আয় বৈষম্য কমানোর দিকে। একই সঙ্গে বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কৃষিপণ্যের, বিশেষ করে খাদ্যশস্য উৎপাদনে প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধি করতে পারলে এবং অধিক পরিমাণে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারলে এই অবস্থন দ্রুত উন্নন ঘটবে। 

বর্তমান সরকার প্রাকৃতিক দুর্যোগ উত্তর বাস্তুচ্যুতদের পুনর্বাসনে সহায়তাই শুধু করছেন না, দুর্যোগের বহু আগে থেকেই পুর্বাভাস শুনেই সব ধরনের জান ও মালের নিরাপত্তাসহ উদ্ধার কর্মযজ্ঞকে তৈরি রাখছেন। এছাড়া গরিব জনগণকে উন্নত জীবনযাপনে উদ্বুদ্ধকরণের মধ্য দিয়ে ছোট পরিবার গঠনে সচেতন করা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে অর্থ বরাদ্দের পরিমাণ বৃদ্ধি করা, দুর্নীতি বন্ধ করা ও উপকারভোগী নির্বাচনে নিরপেক্ষতা বজায় রাখা এবং ধনী-গরিবের আয়  বৈষম্য হ্রাসে ব্যবস্থা নিচ্ছেন। এছাড়া সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় দারিদ্র্য হ্রাসে আওয়ামী লীগ সরকার ক্রমান্বয়ে প্রসার ঘটিয়ে এবং অর্থ বরাদ্দ বৃদ্ধি করে বয়স্ক ভাতা, বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা মহিলা, অসচ্ছল প্রতিবন্ধী, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী এবং দরিদ্র ও কর্মজীবী ল্যাকটেটিং মায়েদের মাতৃকালীন ভাতাভোগীর সংখ্যা ও অর্থ বরাদ্দের পরিমাণ বাড়িয়েছে। বাড়ানো হয়েছে হিজড়া জনগোষ্ঠী, বেদে ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর বরাদ্দ। বেকারসমস্যাও দূর করতে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ফলে খুব দ্রুতই দারিদ্র্য হার নেমে শূন্যের কোঠায় গিয়ে পৌঁছতে আর দেরি নেই। বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতেই আমরা পেতে যাচ্ছি বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ‘সোনার বাংলা’।

Ads
Ads