রাজাকারের তালিকায় ভুল কার?

  • ১৯-Dec-২০১৯ ০৫:০৫ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

প্রথম ধাপে ১০ হাজার ৭৮৯ জন ‘রাজাকারের তালিকা’ প্রকাশ করেছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। স্বাধীনতাবিরোধীদের ওই তালিকায় গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ পরিবারের সদস্য ও সংগঠকের নাম আসায় ক্ষোভ আর সমালোচনার ঝড় ওঠে। দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভও হয়। মুখোমুখি অবস্থান নেয় স্বরাষ্ট্র ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। রাজাকারের তালিকায় মুক্তিযোদ্ধা থাকা প্রসঙ্গে গত মঙ্গলবার মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, ‘স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাই প্রকাশ হয়েছে।’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, ‘আমাদের তথ্য অনুযায়ী তালিকা প্রকাশ হয়নি।’ এরই মধ্যে বুধবার দুপুরে স্বাধীনতা বিরোধীদের তালিকা যাচাই-বাছাই ও সংশোধনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশের কথা জানান আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

বুধবার বিকেলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ওই তালিকা স্থগিত করে।  গতকাল মানিকগঞ্জে শহরের বিজয় মেলা মাঠে জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ আয়োজিত মুক্তিযোদ্ধাদের এক সমাবেশে আ ক ম মোজাম্মেল হক পুনরায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উত্থাপন করে বলেছেন, ‘ওরা (বিএনপি-জামায়াত সরকার) ৩০ বছর ক্ষমতায় ছিল। ক্ষমতায় থাকার সময় তারা হয়তো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে রাখা কাগজপত্র কারসাজি করে রাজাকারদের তালিকায় মুক্তিযোদ্ধাদের নাম লিখে রেখেছে.....এটা আমাদের কল্পনার বাইরে ছিল। সে কারণে ভুলটা হয়ে গেছে। আমি দুঃখ প্রকাশ করছি।’ আর মুক্তিযুদ্ধের মহান নায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভুল ও ভুলের পেছনের সব বিষয় খতিয়ে দেখার নির্দেশ দিয়েছেন। আর বলেছেন, ‘সদ্য প্রকাশিত তালিকা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর করা তালিকা ছাড়া আর কিছু নয়।’ রাজাকারের তালিকা যাচাই-বাছাই করা হবে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘আমি একটা কথা স্পষ্ট বলে দিতে চাই, কোনো মুক্তিযোদ্ধাকে রাজাকার খেতাব দেওয়া হবে না। এটা হতে পারে না...এটা অসম্ভব, অন্তত আমার সময় না।’ বিষয়টি তিনি ‘ক্ষমার দৃষ্টিতে’ দেখতে বলেছেন।

মুক্তিযুদ্ধ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বিষয়ে এমন ভুল যে কারণেই বা যে মন্ত্রণালয়ই করুক না কেন তা শুধু দুঃখজনকই নয়, স্বাধীনতার চেতনায় উদ্ভাসিত বাঙালির জন্য বিব্রতকরও বটে। এমন এক বিব্রতকর পরিস্থিতিতে দুঃখ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় যার যার বক্তব্য দিয়েছেন। আওয়ামী লীগ সরকারই মুক্তিযোদ্ধাদের সর্বোচ্চ সম্মান দিয়েছে। সেদিক বিবেচনায় রেখে একথা স্পষ্টই বলা যায় যে, আওয়ামী লীগ সরকার কখনোই কোনো মুক্তিযোদ্ধাকে ছোট করতে পারে না। বরং আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে এই ভুল একটি ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কিছুই না। 

এরই মধ্যে আমরা দেখেছি, বিভিন্ন মাধ্যমে এই তালিকা তৈরিতে ‘৬০ কোটি টাকা খরচ’ হয়েছে বলে গুজব ছড়ানো হয়েছে। অথচ মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল স্রেফ জানিয়ে দিয়েছেন, এ কাজে ‘৬০ পয়সাও খরচ হয়নি’। এই গুজবই ষড়যন্ত্রের প্রথম ধাপকে নিশ্চিত করেছে।

মন্ত্রী আগেই দুঃখ প্রকাশ করে তালিকা স্থগিতও করেছেন। তিনি বলেছিলেন, ‘রাজাকারদের তালিকায় মুক্তিযোদ্ধাদের নাম আসায় আমি অত্যন্ত দুঃখিত। আমার নাম ওই তালিকায় এলে আমি যেভাবে কষ্ট পেতাম, তারাও এমন কষ্ট পেয়েছেন। এই বিষয়ে আমরা ব্যথিত।’ তারপরও এ বিষয়কে আরও ঘোলাটে করতে অনেকেই বদ্ধপরিকর বলে অনুমিত হচ্ছে। রাজাকারের তালিকায় মুক্তিযোদ্ধার নাম আসায় দেশ-জাতির কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানিয়ে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হককে উকিল নোটিস পাঠিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের এক আইনজীবী। মন্ত্রী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ক্ষমা না চাইলে ‘প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার’ হুমকি দেওয়া হয়েছে ওই নোটিসে। যেকথা মন্ত্রী আগেই স্বীকার করে নিয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধা সংসদের বরাত দিয়ে নোটিসে বলা হয়েছে, ‘রাজাকারের তালিকায় শহীদ পরিবারের সদস্যদের নাম থাকলেও চিহ্নিত রাজাকারদের নাম বাদ পড়েছে। প্রকাশিত রাজাকারের তালিকায় মুক্তিযোদ্ধাদের নাম থাকায় দেশের সব মুক্তিযোদ্ধার হৃদয়ে আঘাত করা হয়েছে। তাদের অসম্মান করা হয়েছে; যা দেশ ও জাতির জন্য লজ্জাজনক।’ আর প্রধানমন্ত্রী গত বুধবার বলেছেন, ‘এটা নিয়ে যারা কষ্ট পেয়েছেন, দুঃখ পেয়েছেন তাদেরকে বলব- শান্ত হোন এবং বিষয়টি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখুন...তাদের (মুক্তিযোদ্ধারা) নাম রাজাকারের তালিকায় থাকতে পারে না...তারা নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন।’

আমাদের মনে রাখতে হবে, বঙ্গবন্ধুকন্যা আমাদের জাতির পিতার গুণে গুণান্বিত। তিনি এ বিষয়টিকে হালকাভাবে কখনোই দেখছেন না। সেজন্য তিনি ‘নিশ্চিন্তে’ থাকার কথা বলেছেন মানে আর কোনো চিন্তা নেই। এই তালিকায় ভুলকারীদের বিরদ্ধে সঠিক পদক্ষেপ তিনি নেবেনই। কার ভুল আর কার ভুল নাÑ তা তিনি নির্ণয় করবেনই। 

Ads
Ads