উন্মুক্ত উপাচার্যের স্বৈরচারী কাণ্ড: পর্ব-১

  • ২১-Dec-২০১৯ ০৪:৫৪ অপরাহ্ন
Ads

#অফিসের নামে বাবা-ছেলের বিলাসবহুল বিশ্রামাগার
#কোণঠাসা শিক্ষক-কর্মকর্তারা

:: জি এম রফিক ::

বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় (বাউবি) উপাচার্যের অনিয়ম ও দুর্নীতির কারখানায় পরিণত হয়েছে ঢাকা আঞ্চলিক কেন্দ্র। এক তরফা সিদ্ধান্ত আর স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে বিবিএ ও এমবিএ প্রোগ্রাম থেকেই পকেটে তুলে নিচ্ছেন ৪০ শতাংশ টাকা। বাকি ৬০ শতাংশ বাউবির ফান্ডে জমা হওয়ার কথা থাকলেও স্বজনদের মধ্যে বাঁটোয়ারা হয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ আছে, সমাবর্তনের কথা বলে তোলা কোটি কোটি টাকা লোপাট ও নিয়োগ বাণিজ্যের, একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতির নামে কটূক্তিরও। এদিকে ভবনের চতুর্থ ও পঞ্চম তলায় অফিসের আড়ালে তৈরি করা হয়েছে বাপ-ছেলের বিলাসবহুল বিশ্রামাগার। যেখানে তারা বিশেষ মুহূর্ত কাটান বলে রয়েছে তথ্য। অন্যদিকে পরিচিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বাজেটের ৫ শতাংশ টাকার বিনিময়ে কাজ পাইয়ে দিয়ে নিম্নমানের সামগ্রীতে সম্পন্ন করেছেন বিভিন্ন উন্নয়নমূলক নির্মাণ প্রকল্প। শুধু ২০১৮-১৯ অর্থ বছরেই বাউবির ২৫৬ কোটি টাকা বাজেটের ৫ শতাংশ হিসেবে তার পকেটস্থ হয়েছে ১২ কোটি ৮০ লাখ টাকা। উপাচার্যের এমন সব স্বৈরাচারী মনোভাবে অতিষ্ঠ শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে অন্তোষ। চলছে চাপা কানাঘুষা। বাউবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম এ মাননানের অনিয়ম, দুর্নীতি ও অভিযোগের তথ্য নিয়ে আজ থাকছে প্রথম পর্ব।

ঢাকা কলেজের পাশে ধানমন্ডি এলাকায় বাউবির ঢাকা আঞ্চলিক কেন্দ্র। উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শুধু এই ক্যাম্পাসটিতেই অনার্স ও মাস্টার্সের প্রোগ্রাম চালু আছে। পাশাপাশি অন্যান্য কেন্দ্রের মতো ডিগ্রি, ডিপ্লোমা, শর্ট কোর্সসহ অন্যান্য কার্যক্রম তো আছেই। বিশাল অংকের শিক্ষার্থীর তুলনায় কোর্স বেশি হওয়ায় ও স্থান স্বল্প থাকায় প্রায় সময়ই ক্লাস রুমের ঘাটতি দেখা দেয়। অথচ এর ৪র্থ তলার অর্ধেক দখল করেছেন উপাচার্য। সেখানে বিলাসবহুল বিশ্রামাগার বানিয়ে নাম দেওয়া হয়েছে ‘উপাচার্যের অফিসকক্ষ’। বাকি অর্ধেকে ছোট ছোট কামরায় সাজানো হয়েছে প্রো-ভিসি, ট্রেজারার এবং রেজিস্ট্রারের কক্ষ। জানা যায়, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত উপাচার্যের ‘বিশ্রামাগার’ সাজানো হয়েছে সাড়ে চার লাখ টাকার পালঙ্ক, ফ্রিজ ও অন্যান্য দামি আসবাবপত্রে। যার অর্থও যোগান দিতে হয়েছে বাউবিকেই। অন্যদিকে ‘নিয়ম সংশোধন করে ছেলেকে সহযোগী অধ্যাপক পদে নিয়মবহির্ভূত নিয়োগ দিয়ে’ তার জন্য ভবনের ৫ম তলার একইভাবে গড়ে দেওয়া হয়েছে ‘বিশ্রামাগার’। অথচ শ্রেণি কক্ষের অভাবে বিভিন্ন প্রোগ্রামের ক্লাস বন্ধ থাকছে। আর কখনো কখনো শিক্ষার্থীদেরকে ক্লাস করতে হচ্ছে দাঁড়িয়ে। 

বাউবির সাধারণ শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আঞ্চলিক কেন্দ্রে উপাচার্য, প্রো-ভিসি, ট্রেজারার সাধারণত আসেন না। গাজীপুরে বাউবি মূল ক্যাম্পাসে ৫ দিন অফিস করতে হয় তাদের। শিক্ষার্থীরা জানান, শিক্ষার্থীদের ধারণ ক্ষমতার তুলনায় ছোট আঞ্চলিক কেন্দ্রের দুই ফ্লোরের অর্ধেক করে দুজন দখলে না রাখলে পড়াশোনার ভোগান্তি পোহাতে হত না। উপাচার্যের কার্যক্রমকে ‘স্বৈরাচারী ও স্বজনপ্রীতিমূলক’ আখ্যা দিয়ে তারা জানান, সন্ধ্যাকালীন বিবিএ ও এমবিএ প্রোগ্রামের ৪০ শতাংশ টাকা ভিসি নিজে, তার মেয়ে জামাই ও ছেলে জাহেদ মাননানকে দিয়ে জেড এ এইচ ই ডি ক্লাস নিয়ে পকেটে তোলেন। অন্য শিক্ষককে খুব কমই ক্লাস দিয়ে থাকেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সূত্রে জানা যায়, এই প্রোগ্রামের বাকি ৬০ শতাংশ টাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফান্ডে জমা দেওয়ার কথা থাকলেও উপাচার্য তা না করে নিজেরাই বাটোয়ারা করে নেন। শিক্ষার্থীরা জানান, এসব কথা বলতে গেলে রেজাল্ট খারাপ করে দেওয়ারও হুমকি দেওয়া হয়। ফলে ‘অসন্তোষ’ বিরাজ করলেও মুখ ফুটে কিছু বলতে পারেন না তারা। শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করে বলেন, ‘বাউবিতে তুলনামূলক বেশি বেতন ও সেমিস্টার ফি। তারপরও কোনো সুযোগ-সুবিধা বরাদ্দ নেই।’ তারা জানান, অনেক সময় ঠিক মতো পরীক্ষা নেওয়া হয় না এবং দেরিতে ফল প্রকাশ করা হয়। কর্তৃপক্ষের এসব গাফিলতিতে অতিষ্ঠ তারা।’

অন্যদিকে প্রতি বছর শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রতিষ্ঠানের ক্যালেন্ডারের জন্য মাথাপিছু ৬০ টাকা করে নেওয়া হয়। বাউবিতে বিভিন্ন প্রোগ্রামে ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষে ৫ লাখ ২০ হাজার ৭৪ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। সে হিসাবে ৩ কোটি ১২ লাখ ৪৪ হাজার ৪০টাকা ওঠানো হয়েছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদেরকে কোনো ক্যালেন্ডার দেওয়া হয়না। এই টাকার কোনো হিসাবও দেননি তিনি। শুধু তাই নয়, গত ২০১৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত কোনো ক্যালেন্ডারই ছাপা হয়নি বলে সরেজমিন দেখা যায়। জানা যায়, হিসাব পরিচালক ভিসির আত্মীয় হওয়ায় তার সঙ্গে যোগসাজশে বিভিন্ন খাতে ব্যয় দেখিয়ে উক্ত টাকা ভিসি নিজেই পকেটে তুলে নেন। তার এসব কালো টাকা ‘ফাইভএম গ্রুপ’ নামে নিজস্ব অনলাইন শপের মাধ্যমে সাদা করে নেন বলে জানা যায়। এদিকে আঞ্চলিক কেন্দ্রের প্রধান তোরণ নির্মাণে দেখানো হয়েছে প্রায় ৮০ লাখ টাকা। অথচ যার ব্যয়ের অর্ধেকেরও কম বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা। ‘মধু কনস্ট্রাকশন’ নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ২০১৩ সাল থেকে বাউবির নির্মাণমূলক সব কাজই তিনি করে থাকেন। জানা যায়, কাজ পাইয়ে দেওয়ায় উপাচার্য খুব সুকৌশলে তার বন্ধু খলিলুল্লাহ খানকে সকল কমিটির বহিঃসদস্য হিসেবে রেখে তাকে দিয়ে টেন্ডার বাছাইসহ নানা অপকর্ম করিয়ে নেন। আর কাজ পেতে মূল বাজেটের ৫ শতাংশ টাকা আগেই পরিশোধ করতে হয় উপাচার্যকে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, নিজের ছেলেকে নিয়োগ দিতে মন মতো নীতিমালা করতে বিওজির কাছে অনুরোধ করে নিয়োগ নীতিমালা সংশোধনের ক্ষমতা নেন উপাচার্য স্বয়ং। এরপর নিয়োগে ‘অযোগ্য’ ছেলেকে নিয়োগদানের জন্য দফায় দফায় নীতিমালা, বিধিমালা সংশোধন করেন তিনি। পরে সংশোধিত নিয়মে ছেলে জাহেদের নিয়োগে আর কোন বাধা না থাকলে ঘোষণা করেন আবেদনের তারিখ। পরে উচ্চতর ডিগ্রি ছাড়াই সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে সরাসরি নিয়োগ দেওয়া হয় তাকে। এরও পরে উপাচার্য মাননান দ্বিতীয় দফায় নিয়োগ পাওয়ার পর আবারও নিয়োগ নীতিমালা সংশোধন করে আত্মীয়দের নিয়োগ দেন তিনি। এই দফায় চাকরি পান উপাচার্যের শ্যালিকা আজরা বেগম (নিয়োগের সময় বয়স ছিল ৩৮) এবং আরেক আত্মীয় কামারুল ইসলাম। 

এদিকে সমাবর্তনের নাম করে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ২০১৮ সালে তোলা হয় টাকা। আবার সমাবর্তনের নামে এই টাকার প্রায় ৫০ লাখ খরচও করেছেন তিনি। কিন্তু আজও সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়নি। কেন সমাবর্তন হচ্ছে না এমন গুঞ্জন শুরু হলে প্রশাসনিক লাউঞ্জে বাউবির নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম রেজাউল ইসলাম বলেন, ‘সমাবর্তন কীভাবে হবে, তিনি (রাষ্ট্রপতি) তো খাম ছাড়া নড়েনই না।’ এই বিষয়ে ভিসির কাছে লিখিত অভিযোগ দেন এক কর্মকতা। পরে ভিসি অভিযোগ পেয়ে অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে বরং অভিযোগকারী কর্মকর্তাকে অভিযোগ করার কারণে শাস্তিস্বরুপ ঢাকার বাইরে বদলি করে দেন। বাউবির নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম রেজাউল ইসলাম এসব বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অভিযোগটি যেহেতু ভিসি স্যারের বিরুদ্ধে, সেহেতু আমি এ বিষয়ে কোন তথ্য বা বক্তব্য দিতে চাচ্ছি না।’ আর সমাবর্তনের বিষয়ে রাষ্ট্রপতিকে কটূক্তি প্রসঙ্গ তিনি অস্বীকার করে বলেন, ‘এমন ধরনের কথা আমি বলিনি।’ তাহলে এক কর্মকর্তা অভিযোগ করলেন কেন, জানতে চাইলে তিনি এর কোন উত্তর দেননি।

উপাচার্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও দুর্নীতি প্রসঙ্গে একাধিক বার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও উপাচার্য কথা বলতে রাজি হননি। পরে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি কল ধরেননি। পরে তার ব্যক্তিগত সহযোগী বলেন, ‘স্যার ব্যস্ত আছেন।’ এরপর উপাচার্যের ব্যক্তিগত মুঠোফোনে ক্ষুদে বার্তা পাঠালেও কোনো উত্তর আসেনি।

বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন চেয়ারম্যান ড. কাজী শহিদুল্লাহ বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা ছিল না। উপাচার্য যদি এমন কাজ করে থাকেন তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন খতিয়ে দেখে যথাযথ ব্যবস্থা নেবে।’ রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে বাউবির নির্বাহী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি অতিব দুঃখজনক। সব বিষয়েই খতিয়ে দেখা হবে।’

বাউবি উপাচার্যের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল বলেন, ‘উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে নেতিবাচক কিছু তথ্য এর আগেও আমরা পেয়েছি। বিষয়টি মন্ত্রণালয় খতিয়ে দেখে এর যথাযথ ব্যবস্থা নিবে।’ 

Ads
Ads