উন্মুক্ত উপচার্যের স্বৈরাচারী কাণ্ড: পর্ব-২

  • ২৮-Dec-২০১৯ ০৫:১১ অপরাহ্ন
Ads

লোলুপ দৃষ্টি নির্মাণখাতে

:: জিএম রফিক ::

বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাউবি) দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই নির্মাণ খাতে বেশি নজর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম এ মাননানের। গাজীপুরের প্রধান ক্যাম্পাসসহ আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক কেন্দ্রগুলোতেও চলছে নির্মাণে হরদম অনিয়ম। অনেক প্রকল্পের কাজ নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে সম্পন্ন হলেও উপাচার্যের হস্তক্ষেপেই অডিট বিভাগও হয়ে যান ম্যানেজ। এরআগে ২০১৬ সালের আগের এক কোষাধাক্ষ্য হিসাব খাতের ভুল ধরায় ষড়যন্ত্রমূলকভাবে তাকে সরিয়ে নিজস্ব কোষাধাক্ষ্যকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলেও রয়েছে অভিযোগ। বাউবির প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের নাকের ডগায় এমন সব অনিয়ম-দুর্নীতি ঘটলেও পদোন্নতির স্বার্থে মুখ খোলেন না কেউই। আবার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অধিকাংশই নাকি তার নিজস্ব, তাই তারা সব অনিয়ম চেপে যান বলেও জানান অনেকে। উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় উপচার্যের স্বৈরাচারী কাণ্ডের দ্বিতীয় পর্বে আজ থাকছে নির্মাণ খাতের অনিয়ম।

২০১৩ সালে প্রথম দফায় বাউবিতে চার বছরের জন্য উপাচার্য হয়ে আসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. এম এ মাননান। বাউবিতে পা রেখেই তার নজর চলে যায় নির্মাণ প্রকল্পের দিকে। পাশাপাশি স্নাতক কোর্সেও। যদিও প্রথমে এই কোর্স তিনি ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে বন্ধ করে দেন। তবে হিসাবের অঙ্কে কম পড়তেই খুলে দেন আবারও। কারণ হিসেবে জানা যায়, নির্মাণ প্রকল্প ও স্নাতকেই নাকি টাকার ছড়াছড়ি। নিজের দুর্নীতির কর্মকা-ের শুরুতে চাতুরতার আশ্রয় নেন বলে অভিযোগ করেন অনেকে। সূত্র জানায়, কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরকে নিজের পকেটে আনতে উপাচার্য চুপিসারে তার আস্থাভাজনদের বাছাই শুরু করেন। উত্তীর্ণ হলেই তিনি হয়ে ওঠেন তার প্রিয়ভাজন। আর বিরুদ্ধাচারণ না করলেও যারা আগের ভিসির সময়েও ঘটে যাওয়া অনিয়ম নিয়ে কথা বললেই তারা হয়ে ওঠেন ভিসি মাননানের কাছে শত্রু। 

জানা যায়, প্রথম মেয়াদের শুরুর দিকে নির্মাণসহ নানা বিষয়ে খুব একটা সুবিধা করতে না পারায় সে সময়ের কোষাধাক্ষ্যকে বদলি করে দেওয়া হয়। পরে হিসাব বিভাগের না হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. আশফাক হোসেনকে ২০১৬ সালের ১৭ ডিসেম্বরে কোষাধাক্ষ হিসেবে নিয়োগ দেন তাকে। এরপর সুনিপুনভাবে নির্মাণখাত থেকে পকেস্থ করার কাজ জোরেশোরে করতে থাকেন এই উপাচার্য। ২০১৮ সালে দ্বিতীয় দফায় আবারও নিয়োগ পেলে পুরোদমে ‘স্বৈরাচার’ হয়ে ওঠেন বলেই একাধিক সূত্রের দাবি। তারা নাম না প্রকাশ করার সূত্রে জানায়, নির্মাণ খাতের যেকোনো কাজের বাজেট থেকে ৫ শতাংশ টাকা উপাচার্যকে দিতে হয়। এই দুর্নীতি চরিতার্থ করার জন্য উপাচার্য মাননান নিজের পছন্দের ঠিকাদারকে দিয়ে থাকেন কাজ। অধিকাংশ পায় ‘মধু ইন্টারন্যাশনাল’ নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। কাজ পাইয়ে দিতে স্বচ্ছতা দেখাতে উপাচার্যের সহযোগিতায় থাকেন তারই মনোনিত অধিকাংশ কমিটির বহিঃসদস্য বন্ধু খলিলুল্লাহ খান। এদিকে প্রতি বছরই উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘পূর্ত ও রক্ষণাবেক্ষণ’ সহ নির্মাণ ও সংস্কার খাতে বাজেট বাড়লেও কাজ দৃশ্যমান নয়।  

এক হিসাবে দেখা যায়, গত দুই অর্থ বছরে ‘পূর্ত ও রক্ষণাবেক্ষণ’ খাত থেকেই উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম এ মাননান ৫ শতাংশ হিসাবে ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। এই দুই অর্থ বছরের মোট ৩২ কোটি টাকা এই খাতের বাজেটে দেখা যায়। অর্থ বিভাগসূত্রে জানা যায়, ২০১৮-২০১৯ অর্থ বছরে ‘পূর্ত ও রক্ষণাবেক্ষণ’ খাতে ১২ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। আর ২০১৯-২০২০ অর্থ বছরে এই খাতের বরাদ্দ ২০ কোটি টাকা। এছাড়া সিলেট আঞ্চলিক কেন্দ্র, বরিশাল উপ-আঞ্চলিক কেন্দ্র, ফরিদপুর আঞ্চলিক কেন্দ্রে ডিপ-টিউবওয়েল স্থাপনে প্রতিটিতে গড়ে ২৮ লাখ টাকা করে মোট ৮৪ লাখ টাকার ব্যয় দেখানো হয়। অথচ সাড়ে ৮শ’ থেকে ৯শ’ ফুটের এই ডিপ-টিউবওয়েলের জন্য এত টাকা ব্যয় হওয়ার কথা নয় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। অন্যদিকে গাজীপুরের বাউবির মূল ক্যাম্পাসে বঙ্গবন্ধুর মায়ের নামে নির্মিত বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব অডিটোরিয়াম কাম ট্রেনিং সেন্টারে ২৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। বর্তমানে আভ্যন্তরীণ কাজ চলছে। অভিযোগ আছে, নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে নির্মাণ কাজ চলাকালীন কয়েক কর্মকর্তা-কর্মচারী মৌখিকভাবে উপাচার্যকে জানালে তিনি অভিযোগকারীদের অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন। এর আগে আঞ্চলিক কেন্দ্রের প্রধান তোড়ন নির্মাণে দেখানো হয়েছে প্রায় ৮০ লাখ টাকা। যেখানে রয়েছে কারচুপির অভিযোগ।

সূত্রের নানা অভিযোগে এই প্রতিবেদক অডিট বিভাগে খোঁজ নিতে শুরু করলে আসল গোমর বেরিয়ে আসে। জানা যায়, অডিট বিভাগকে দিয়ে উপাচার্য তার মক্ষম কাজটি করিয়ে নেন সুকৌশলে। এই বিভাগের যুগ্ম পরিচালক মিয়া মনিরুজ্জামানের মাধ্যমে ঊর্ধ্বতন অন্যান্য কর্মকর্তাকে সন্তুষ্ট করে নিয়ে নেন কাজের স্বচ্ছতার সনদ। যেখানে মানা হয় না অডিটের ক্ষেত্রে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন ২০০৬ এবং প্রকিউরমেন্ট নীতিমালা ২০০৮।

সরকারের কঠোর নীতিমালা ও নজরদারি প্রয়োজন মন্তব্য করে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা কিছু বলতে গেলেই বদলি করে দেবেন। এর আগেও এমন হয়েছে। এর আগের ট্রেজারার উপাচার্যের বিপক্ষে যেদিন থেকে অবস্থান নেন, হিসাবে ভুল ধরিয়ে দেন, সেদিনের পর রাতারাতি তাকে বদলি করে দেওয়া হয়। আবার ডিপ-টিউবওয়েলের এত খরচ নয় বলে মন্তব্য করলে আরেক কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে। মূলত তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের লোকজনকে চাকরি দিয়ে ভরে রেখেছেন। আমরা দায়িত্বে থাকলেও কিছুই করার নেই।’ 

বিভিন্ন কমিটির বহিঃসদস্য খলিলুল্লাহ খানের সঙ্গে উপাচার্যের সখ্যতা প্রসঙ্গে খলিলুল্লাহ বলেন, ‘ভিসি মাননান সাহেব আমার বন্ধু, এটা ঠিক। কিন্তু কোনো অনিয়মের সঙ্গে আমি জড়িত নই।’ প্রায় সকল কমিটির তিনিই বহিঃসদস্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি ভালো দিক নির্দেশনা দিতে পারি বলে বোধ হয় তিনি আমাকে কমিটিতে রাখেন।’

বাউবির যুগ্ম পরিচালক (অডিট) মিয়া মনিরুজ্জামান বলেন, আমার ওপরে আরও ২ জন অডিটের দায়িত্বে আছেন। তাদের পরামর্শ ছাড়া আমি কোনো বক্তব্য দিতে পারবো না।’

বাউবির নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম রেজাউল ইসলাম এ বিষয়ে বলেন, ‘আমাদের যে নিয়ম আছে, সেই নিয়মকানুন মেনেই আমরা কাজ করে থাকি। যদি কোনো অনিয়ম হয়ে থাকে, সেটা আমার মাধ্যমে হয়নি।’ এছাড়া যেকোনো কাজের সরাসরি তত্ত্বাবধান উপাচার্য মাননান করে থাকেন বলেও তিনি জানান। 

কোষাধাক্ষ্য অধ্যাপক ড. আশফাক হোসাইনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি মুঠোফোনে জানান, তার মা অসুস্থ। হাসপাতালে আছেন। পরে এসব বিষয়ে তিনি কথা বলতে পারবেন। 

উপাচার্য মাননানের সঙ্গে বারবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলে গতকাল সম্ভব হয়নি। পরে ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হয়। কিন্তু কথা বলা যায়নি। এর আগে গত সপ্তাহে নির্মাণকাজে অনিয়ম-দুর্নীতিসহ বিভিন্ন অভিযোগ প্রসঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ইঙ্গিতপূর্ণ ‘বসার আমন্ত্রণ’ জানান।


 

Ads
Ads