সব রাজনৈতিক দলই হোক সুসংগঠিত 

  • ৪-জানুয়ারী-২০২০ ০৪:২৮ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

গণতান্ত্রিক দেশে রাজনৈতিক দল সুসংগঠিত হলে সে দেশ উন্নয়নের শিখরে চড়বেই। সুসংগঠিত আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর বাংলাদেশের উন্নয়নই এর প্রমাণ। বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি চোখে পড়ার মতো। অবকাঠামোগত উন্নয়ন দৃশ্যমান। সরকারের দৃঢ় পদক্ষেপের কারণে দেশ থেকে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ প্রায় বিলুপ্তির পথে। আগে চুরি-ছিনতাই খুব সাধারণ ঘটনা হলেও এখন তা আর শোনা যায় না। কারণ সব স্তরের মানুষই কোনো না কোনো পেশার সঙ্গে জড়িত, বেকার সমস্যা প্রায় নেই বললেই চলে। মাথাপিছু আয় বেড়েছে। বঙ্গবন্ধুকন্যা ও আওয়ামী লীগ সভাপতি, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সুসংগঠিত ক্ষতাসীন আওয়ামী লীগ দেশকে এই অবস্থানে উন্নীত করতে সক্ষম হয়েছে। অপরাপর রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এমন শৃঙ্খলা থাকলে বাংলাদেশ আরও দ্রুত এগিয়ে যেত।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে ক্ষমতাসীন দলকে সুসংগঠিত হওয়ার পাশাপাশি বিরোধী দলগুলোকেও সুসংগঠিত হতে হয়। কারণ, বিরোধী দল মানে সরকারের বিরোধিতা নয়, বরং সরকারের উন্নয়নমূলক কাজের প্রশংসার সঙ্গে সঙ্গে দেশের স্বার্থে ভুল-ত্রুটিকে তুলে ধরে সুমসৃণ করে তোলাই উদ্দেশ্য। ক্ষমতাসীন শক্তির বিরোধিতা করার বিষয়টি কেবল ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়, তার জন্য সংগঠিতভাবে দল গঠন এবং আদর্শিক ও ঐক্যবদ্ধভাবে কর্মকা- পরিচালনার মধ্য দিয়েই সরকারের বিকল্প উপস্থাপন করা যেতে পারে। অষ্টদশ শতাব্দীর আগে যে দেশে ক্ষমতাসীনের বিরুদ্ধে বলাকে বিবেচনা করা হতো রাষ্ট্রদ্রোহ বলে, সেই ইংল্যান্ডেই ক্ষমতাসীনরাও বিরোধীদের দল গঠন এবং জাতীয় বিভিন্ন প্রশ্নে তাদের অবস্থানকে বৈধ এবং সংগত বলে মনে করতে থাকে। আর আমাদের দেশে, বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারে সময়ে, বিরোধীদলকে মুক্ত মনে সব বিষয়ে স্বাধীনভাবে কথা বলার সুযোগ করে দিয়েছে। ফলে তারা সরকারের কাজের সমালোচনা করতে পারেন। তবে বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে, বিরোধীদলের ও অপরাপর দলসমূহ সুসংগঠিত না হওয়ায় সরকারের যে কোনো কাজকে সমালোচনা করতে হবে বলে সমালোচনা করা হচ্ছে। এতে অনেক সময় সাধারণ জনগণ বিভ্রান্ত হচ্ছে। আবার সরকারের উন্নয়নমূলক কাজকে বিভিন্ন গুজবের পর্দার আড়ালে ঢেকে দিতেও দেখেছি আমরা। যা জনসাধারণের নিরাপত্তাকে দুর্বিষহ করে তুলেছিল। অর্থনৈতিক খাতকে উত্তপ্ত করে তুলতে বাণিজ্য খাতকে গুজবের মোড়কে বাঁধার চেষ্টাও করতে কম যায়নি বিশেষ একটি রাজনৈতিক দল। অসংগঠিত বলেই এমন ধরনের অরাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে বাস্তবায়নের পথে নেমেছিল সেই দলের নেতাকর্মীরা। এটা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য খুবই খারাপ দিক। গণতন্ত্রের একটা প্রধান লক্ষণ হচ্ছে, এই ব্যবস্থা জনসাধারণকে পছন্দের সুযোগ দেয়। একমাত্র গণতন্ত্রই ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার নিশ্চয়তা দেওয়ার পাশাপাশি সেই ভুল সংশোধনের সুযোগও উন্মুক্ত রাখে। গণতন্ত্র এটা পারে এজন্য যে, এই তন্ত্রে বিপরীতমুখী রাজনৈতিক দলের সুসংগঠিত শক্তিশালী উপস্থিতি থাকে। এই কারণে রাজনৈতিক দল গঠনের পেছনে আদর্শের প্রশ্নটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আদর্শহীনভাবে গুজব রটিয়ে, জঙ্গিবাদ দিয়ে সরকারকে পিছিয়ে রাখা মানে দেশের ক্ষতি, দশের ক্ষতিÑ এটা মাথায় রেখেই রাজনৈতিক দলকে এগিয়ে যাওয়া উচিৎ। 

জন স্টুয়ার্ট মিল ১৮৫৯ সালে অন লিবার্টি বইয়ে লিখেছেন, সুস্থ রাজনীতির জন্য যেমন দরকার স্থিতিশীলতার পক্ষের দল, তেমনি দরকার প্রগতিশীলতার বা সংস্কারের পক্ষের দল। বিপরীতমুখী চিন্তাভাবনার এবং আদর্শের মধ্যকার প্রতিদ্বন্দ্বিতা সমাজে উপস্থিত থাকলে আমরা তার প্রতিফলন দেখতে পাব রাজনীতিতে সংসদে এবং সংসদের বাইরেও। আধুনিক অর্থে রাজনৈতিক দলের উদ্ভবের প্রশ্নটি গণতন্ত্রের সঙ্গেই জড়িত, সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার যে কারণে রাজনৈতিক দলকে ‘গণতন্ত্রের সন্তান’ বলে বর্ণনা করেছেন। বাংলাদেশে বর্তমানে ‘গণতন্ত্রের সন্তান’ বলতে একটি দলকেই আমরা দেখি। আর সেটা বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গবন্ধুকন্যার পরিশ্রমের ফসল, জনতার প্রাণের স্পন্দন আওয়ামী লীগ। সুসংগঠিত এই রাজনৈতিক দলকে আরও সফলভাবে সরকার পরিচালনা করতে সুসংগঠিত রাখার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘একটা সরকার সফলভাবে কাজ করতে পারবে তখনই, যখন দল সুসংগঠিত থাকে। কারণ দল সুসংগঠিত থাকলে, এটা হচ্ছে সরকারের জন্য বিরাট শক্তি।....এই শক্তিটাই সব থেকে বেশি কাজে লাগে একটা দেশকে উন্নত করতে। যেটা আমি নিজে উপলব্ধি করি এবং সে কারণে আমি সবসময় সংগঠনের ওপর সব থেকে গুরুত্ব দিই।’ 

’৭৫-এর পর আমরা দেখেছি বাংলাদেশে ১৯টা ক্যু হয়েছে। এই বছরেই বঙ্গবন্ধুকে হত্যার উদ্দেশ্য ছিল আওয়ামী লীগকে শেষ করে দেওয়া, যেন এ সংগঠন আর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিতে না পারে। সামরিক বাহিনীর হাজার হাজার কর্মকর্তাকে হত্যা করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের বহু নেতাকর্মীকে অত্যাচার-নির্যাতন করা হয়েছে। অনেককে খুন করে গুম করা হয়েছে। এই অত্যাচার নির্যাতনের মধ্যে দিয়েও আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করতে পারেনি। প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে দিয়েও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সঠিক ইতিহাস সাধারণ মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়ার প্রাণপণ চেষ্টা করেছে। তৃণমূল পর্যায় থেকে নেতাকর্মীরা অনেক ত্যাগের বিনিময়ে এই সংগঠনটা ধরে রেখেছে। এটা করতে গিয়ে বহু পরিবার একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেছে। অনেক ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে ১৯৯৬ সালে ফের ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ।

কিন্তু বিরোধী দলের অপপ্রচারের ছিল তুঙ্গে। অন্যদিকে মিডিয়া পাড়া ছিল অনেকটাই তাদের দখলে। ফলে জনগণ হয়েছিল বিভ্রান্ত। আগেই বলেছিলাম, বিরোধী দল যদি তাদের নৈতিক বৈশিষ্ট্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে সেদেশের উন্নয়ন পিছিয়ে পড়ে। তাই যা হওয়ার তাই হলো। উন্নয়ন করতে পারলেও খুব বেশি দৃশ্যমান রেখে যেতে পারল না আওয়ামী লীগ। পরে ২০০৯ সালে আবার সরকারে আসার পর ১১ বছর পার করেছে আওয়ামী লীগ। শুধুমাত্র দেশের উন্নয়ন জনমনে বিশ^াস এমনভাবে স্থাপন করেছে যে কোনো অপপ্রচারই এখন আর তারা কানে তোলেন না। যদিও বাধ্য করতে চেষ্টা করা হয়েছে এবং হচ্ছে মাঝেমধ্যেই। এসব পথ পরিহার করে সব দলই জনগণের মঙ্গলে কাজ করুক। দেশ এগিয়ে যাক। সুসংগঠিত দল নিয়ে জনগণের কাজ করতে গিয়ে জনগণের খুব কাছে যারা পৌঁছতে পারবে তারাই জনগণের সরকার হয়ে থাকুক, যেভাবে ১১ বছরের মতো আছে সুসংগঠিত আওয়ামী লীগ। 

Ads
Ads