ভিসিদেরকে দুর্নীতিমুক্ত হতে হবে

  • ১২-জানুয়ারী-২০২০ ০৪:১৭ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

কিছু দিন পর পরই বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্যদের বিরুদ্ধে (ভিসি) অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ উঠছে। আবার অভিযোগ ওঠানোই শিক্ষার্থী, শিক্ষক-কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার দৃষ্টান্ত এবং পরে সেই অনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে বিশ্ববিদ্যালয় উত্তাল হওয়ার ঘটনা আমাদের সামনেই। গত বছর ৩০ সেপ্টেম্বর এক শিক্ষার্থীকের অনিয়মতান্ত্রিক বহিষ্কারের প্রতিবাদে টানা কয়েকদিনের আন্দোলনের মুখে গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. খোন্দকার নাসিরউদ্দিন পদত্যাগ করেন। পরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েও কয়েক দফায় টানা আন্দোলন, আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার অভিযোগও ওঠে। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের হল বন্ধ রাখা হয়। খোলার কিছুদিন পর আবারও আন্দোলনে নামতে দেখা যায় শিক্ষার্থীদের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েক দিন আগে এক শিক্ষককে একক প্রতিবাদ করতেও দেখা গেছে। ক্লাসে ঢুকতে না দেওয়ায় তিনি বারান্দায় ক্লাস নিয়েছেন বলে খবর আসে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এমন কেন হচ্ছে, এমন কেন হবে এসব প্রশ্ন ঘুরতে থাকে সচেতন জনমস্তিষ্কে। অথচ শিক্ষা সচেতনরা দাবি করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি যদি নৈতিক দায়িত্ব পালন করেন, তিনি যদি নিষ্কলুস থাকেন, যদি দুর্নীতিতে জড়িয়ে না পড়েন তাহলে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হলেও তা টিকে থাকতে পারে না। কারণ ষড়যন্ত্রকারীরা কখনোই দলে ভারি হয় না। তারা সব সময় গুটিকয়েক। আর বর্তমান সরকার সব ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করতে সদা প্রস্তুত। সরকারের প্রতিটি স্তর থেকে ষড়যন্ত্র ও গুজব এক নিমিষেই রুখে দেওয়ার দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে রয়েছে। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা দেশকে, দেশের অর্থনীতির সঙ্গে শিক্ষাকে এগিয়ে নিতে সর্বদা কাজ করছেন। তিনি সব সময় মেধাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে নির্দেশ দিচ্ছেন। এরপরও যেসব ভিসি অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ছেন তারা বিশ্বাস হত্যাকারী। তারা দেশ ও জাতির শত্রু। গত শনিবার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সমাবর্তনে বক্তব্যকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ ওঠায় তাদের সচেতন হতে বলেছেন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর। তিনি বলেছেন, ‘উপাচার্যগণ হলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নির্বাহী। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আপনাদেরকে সততা, নিষ্ঠা ও দক্ষতার পরিচয় দিতে হবে। আপনারা নিজেরাই যদি অনিয়মকে প্রশ্রয় দেন বা দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন, তা হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা কী হবে, তা ভেবে দেখবেন।’ এসময় তিনি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার আইন মেনে চলতে শিক্ষকদের প্রতিও তিনি আহ্বান জানান। 

রাষ্ট্রপতির বক্তব্যে যেসব তথ্য উঠে এসেছে তা আমরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মাধ্যম থেকে জেনেছি। এটা এখন অনেকটাই ওপেন সিকরেট। এক শ্রেণির শিক্ষক রয়েছেন, যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরিটাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন। অনেক সময় সান্ধ্যকালীন কোর্স ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নিয়ে সপ্তাহব্যাপী অতি ব্যস্ত সময় কাটান। এ সব কাজকর্মে তারা খুবই আন্তরিক। যত অনীহা শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্ধারিত ক্লাস নেওয়ার ক্ষেত্রে। তবে এসব শিক্ষক মহোদয়গণ সিলেবাস শেষ করার ব্যাপারেও খুবই সিরিয়াস। তাই তারা একসঙ্গে ৩ থেকে ৫ ঘণ্টা একটানা ক্লাস নেন। অনেক সময় ছুটির দিনে ছাত্র-ছাত্রীদের ডেকে একসঙ্গে কয়েক ঘণ্টা ক্লাস নেন। শিক্ষার্থীরা কতটুকু বুঝল বা কতটুকু গ্রহণ করতে পারলো, সে ব্যাপারে তাদের কোনো দায়-দায়িত্ব বা মাথাব্যাথা আছে বলে মনে হয় না। অথচ ভিসিগণকেও এসব ঘটনায় তৎপর হতে দেখা যায় না। বিষয়গুলোকে কঠোরভাবে দমন করেন না। অথচ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট খরচের সিংহভাগই আসে সরকারি কোষাগার থেকে, আর কোষাগারে টাকা আসে আপামর জনগণের পকেট থেকে। তাই শিক্ষার সেবাটা খুব পরিচ্ছন্ন হওয়া দরকার। শুধু তাই নয়, দেশকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে মেধাবীদের ক্ষুরধার মেধায় পরিণত করতেই হবে। এর কোন বিকল্প নেই। 

শিক্ষকতা অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ পেশা। যারা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন তারা অত্যন্ত মেধাবী ও বিশেষ গুণে গুণান্বিত ও দক্ষ। তাই কোনো ধরনের লোভ-লালসা বা অন্য কোনো মোহের প্রতি আকৃষ্ট না হয়ে পেশার মর্যাদাকে সমুন্নত রাখবেন মহামান্য রাষ্ট্রপতির মতোই সব স্তর থেকেই এমনটা মনে করা হয় ও শিক্ষকদের ওপরে বিশ্বাস রাখা হয়। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাহী দায়িত্বে থেকে অবশ্যই সেই বিশ্বাসের মর্যাদা রাখা একান্ত দায়িত্ব ও কর্তব্য। তাই যে যেই বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করেন সে বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব পালনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। প্রধান নির্বাহী হিসেবে প্রশাসনিক কাজের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে কি না, তাও মনিটরিং করতে হবে।

মহামান্য রাষ্ট্রপতির বক্তব্যের সঙ্গে আমরা পুরোপুরি একমত, ‘আমাদের সংস্কৃতিই আমাদেরকে খুলে দেবে চেতনার দরোজা। ঐশ্বর্যম-িত করবে আমাদের ইতিহাস। তাই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে রক্ষা করার জন্য সবাইকে জোরালোভাবে এখনই এগিয়ে আসতে হবে।’ আর আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে সব সময় শিক্ষকদের অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে দেখেছি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নির্বাহীদের দেখেছি শক্ত ও তীক্ষè নজরে অনিয়মকে রুখতে। অনিয়মেও সঙ্গে নিজেরা জড়িয়েছেন তা আগে দেখিনি আমরা। 

Ads
Ads