পশ্চিমা ৯ কূটনীতিকের বিবৃতি গ্রহণযোগ্য নয়

  • ৩১-জানুয়ারী-২০২০ ০৪:১০ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

আজ রাজধানী ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের নির্বাচন। বহু আকাক্সিক্ষত এই নির্বাচন শান্ত ও সুষ্ঠু পরিবেশে সম্পন্ন হবে দৃঢ়ভাবেই আশা করা যায়। বর্তমান সরকারের আমলে যতগুলো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, তা, শান্তিপূর্ণ পরিবেশেই সম্পন্ন হয়েছে। নির্বাচন নিয়ে কিছু মহল বিতর্কের জন্ম দিতে চাইলেও হালে পানি পায়নি। কিন্তু উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে পশ্চিমা কিছু দেশের একটি বিবৃতি। বিবৃতিটি এমন একসময় দেওয়া হয়েছে যখন দুই সিটির নির্বাচন দোরগোড়ায়। গত বৃহস্পতিবার পশ্চিমা ৯টি দেশ নির্বাচন নিয়ে তাদের বিবৃতি প্রকাশ করে। বিবৃতি পড়ে আমাদের মনে হয়েছে, এই যেন মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশি। বাংলাদেশ নিয়ে এদেশের মানুষের ভালোবাসার কোনো কমতি নেই। বরং অন্যদেশ থেকে অনেকটাই বেশি। এ দেশের মানুষ গণতন্ত্র ভালোবাসে। গণতন্ত্রের জন্য বহু মানুষ প্রাণ দিয়েছে। ৩০ লাখ শহীদ এবং হাজার হাজার মা বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা পেয়েছে। ফলে দেশের ভালোমন্দ এদেশের মানুষই আগে উপলদ্ধি করে থাকে। তাদের দেশে ভালোমন্দ বোঝাতে বিদেশি কূটনীতিকদের ভূমিকার প্রয়োজন আছে বলে আমরা মনে করি না।  সবচেয়ে বড় কথা হলো- জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পরে এ দেশে সেনাশাসন কায়েম হয়। এই শাসকগোষ্ঠি দেশ থেকে গণতন্ত্র বিদায় করে সামরিক আইনে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে। জিয়া এবং এরশাদ এর মূল হর্তাকর্তা ছিলেন। 

গণতন্ত্রের মানসকন্যা, বাংলাদেশের সফল রাষ্ট্রনায়ক ও  বিশ্বনেতা শেখ হাসিনা দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার জন্য দীর্ঘদিন ধরে  সংগ্রাম ও লড়াই চালিয়েছেন। এজন্য তিনি  জেল খেটেছেন।এমনকি মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছেন। এখনো গণতন্ত্রের জন্য তার লড়াই-সংগ্রাম অব্যাহত রয়েছে। জিয়াউর রহমান হ্যাঁ, না ভোট তার ভাষায় রিফারেন্ডাম করে রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর খুনি জিয়া এদেশের মানুষকে প্রহসনের নির্বাচন উপহার দিয়ে ক্ষমতায় টিকে ছিলেন। তারই সৃষ্টদল বিএনপি ক্ষমতায় এসে প্রত্যেকটি নির্বাচন নিয়ে চরম বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। মাগুরা নির্বাচন তার অন্যতম একটি উদাহরন। আজকের নির্বাচনে দলটি কি ধরনের ঘটনা ঘটায় তা দেখার জন্য জনসাধারণ উন্মুখ হয়ে আছে। কারণ জয়ী হওয়ার জন্য তারা মরিয়া।অস্ত্রধারীদের আমদানি করে ভোটকেন্দ্র দখলে নিতে চায়। এঘোষণা দিয়ে তারা  ঘোলাপানিতে মাছ শিকার করতে চায়। কিন্তু দেশের আইনশৃক্সক্ষলা বাহিনী এমন অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে দেবে না। যা তাদের কর্মকা- থেকে দেশবাসীর বিশ্বাস। 

আমরা মনে করি, ঢাকার দুই সিটির নির্বাচন নিয়ে পশ্চিমা ৯টি দেশের কূটনীতিকের বিবৃতিটি সম্পূর্ণ অবৈধ একই সাথে কূটনৈতিক শিষ্ঠাচারের পরিপন্থি। নির্বাচন নিয়ে তারা যে বিবৃতি দিয়েছে তা একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের সামিল। আমরা মনে করি এটা তাদের দায়িত্ব নয়। বিবৃতিদাতা কূটনীতিকরা ভালোভাবেই জানেন, বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতিটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠুভাবে। কোথাও সামান্য গোলযোগ হলেও সেটি বিছিন্ন ঘটনা। গণতন্ত্রের বিকাশ ও তার ভিত্তিমূল  আরো সুদৃঢ় করার জন্য রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা জীবনের ঝুঁকি নিয়েও কাজ করে যাচ্ছেন। তারপরেও পশ্চিমা বিদেশী কূটনীতিরা কী উদ্দেশ্যে এমন অযাচিত বিবৃতি দিলেন, যা রহস্যময় বলেই প্রতিয়মান হচ্ছে। তারা বিএনপি-জামায়াতের পক্ষালম্বন করে কি এ ধরনের বিবৃতি দিয়েছেন তা খতিয়ে দেখার সময় এসেছে। আর একটি বিষয় পশ্চিমা দেশের কূটনীতিদের গভীরভাবে মনে রাখা দরকার যে, বাংলাদেশের মানুষ জীবন দিয়ে গণতন্ত্রকে বাঁচিয়ে রেখেছে। বিএনপি-জামায়াত নামক দল দুটি বর্বর পাকিস্তানি আদর্শ নিয়ে এদেশের মাটিতে শিকড় প্রোথিত করতে চায়। পাকিস্তানপন্থি এই দল দু’টি এদেশের গণতন্ত্রের সঠিক বিকাশ ঘটুক তা কোনো ভাবেই চায় না। কারণ তাদের মুরব্বি পাকিস্তান দেশটিতে এখনো সামরিক জান্তাই গণতন্ত্রের মোড়কে  দেশটি পরিচালনা করছে। তাদের এই গণতন্ত্র যে একেবারেই ফাকা বুলি তা স্পষ্ট।  ফলে ৯ পশ্চিমা কূটনীতি পাকিস্তানের তল্পিবাহক বিএনপি-জামায়াতের পক্ষালম্বন করে গণতন্ত্র চর্চার ব্যাপারে ছবক দিচ্ছে তা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। 

বিএনপি-জামায়াত এ দেশে কি পরিমান ধ্বংসাত্বক কর্মকা- চালিয়েছে তা ওইসব দেশের কূটনীতিদের অজানা থাকার কথা নয়। পেট্রোল বোমা মেরে শত শত মানুষকে হত্যা করেছে বিএনপি এবং তার দোসর জামায়াত। অথচ সেনা চাউনিতে সৃষ্ট বিএনবি বার বার এদেশের মানুষকে গণতন্ত্র সম্পর্কে ছবক দিতে চেয়েছে।যা দেশের মানুষের সঙ্গে চরম উপহাসের সামিল বলে আমরা মনে করি। পশ্চিমা বিদেশি কূটনীতিকদের উচিত ছিল বিএনপি নামক দলটিকে গণতন্ত্রের বিষয়ে জ্ঞান দেওয়া এবং গণতন্ত্র কিভাবে চর্চা করতে হয় তা শিখিয়ে দেওয়া। কিন্তু তারা সেটি কেন করছে না  এটিও আমাদের কাছে প্রশ্নবোধক।  

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে পশ্চিমা ৯ কূটনীতির বিবৃতির ব্যাপারে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী যে বক্তব্য দিয়েছেন তা যথার্থ বলে আমরা মনে করি। গত বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, ‘কূটনীতিকরা নিজেদের কাজ বাদ দিয়ে আমাদের ডমেস্টিক (অভ্যন্তরীণ) ইস্যুতে নাক গলাচ্ছেন। এটা উচিত নয়। ডিপ্লোম্যাটরা কোড অব কন্ডাক্ট মেনে কাজ করবেন বলে আমরা আশা করি। আর যারা কোড অব কান্ডাক্ট মানবেন না, তাদের বলবো দেশ থেকে চলে যান’।
আমাদের প্রশ্ন হলো, যে সব কূটনীতিক ঢাকার দুই সিটির নির্বাচন নিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন, এটা কী তাদের দেশের নির্বাচন নিয়ে কোনো বিদেশি কূটনীতিক এভাবে  ছবক দিলে তাদের দেশকি তা মেনে নিত? না সহজভাবে গ্রহণ করত ? নিশ্চয়ই না।বরং বিবৃতির অপরাধে  দেশ থেকে ওইসব কূটনীতিকদের বহিষ্কার করত। কারণ কূটনীতিতে অন্য দেশের অভ্যন্তরীন বিষয়ে হস্তক্ষেপ কোন ভাবেই সমর্থন করে না। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, তাদের এই কর্মকা- কোন বিশেষ শ্রেণির সুবিধার জন্য বিবৃতি কি না, আবার কোনমহলের পারপার্স সার্ভ করতে তারা ষড়যন্ত্র করছে  কী? আমরা মনে করি এবং বিশ্বাস করি তারা কোনভাবেই সীমা লঙ্ঘন করবেন না। তাদের এই বিবৃতি নিংসন্দেহে কূটনৈতিক শিষ্ঠাচারের পরিপন্থি। বিষয়টি পরিস্কার করা এখন বিবৃতিবাজ কূটনৈতিকদের নৈতিক দায়িত্ব। যৌথ বিবৃতিতে তারা ‘ঢাকা সিটি করপোরেশনে ১ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চার সুযোগ দেওয়ার যে পরামর্শ দিয়েছে সেটিও কূটনৈতিকদের কর্মকান্ডের বাইরে। তারা বলেছেন,‘আমরা আশা করব, শহরজুড়ে ভোটকেন্দ্রগুলোয় গণতন্ত্রের চর্চা হবে। আমাদের প্রত্যাশা উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে ভোটারদের অধিকারের প্রতি বাংলাদেশের সরকার, নির্বাচন কমিশন ও রাজনৈতিক দলগুলো শ্রদ্ধা দেখাবে।’ তাদের এই বক্তব্যর গুরুত্ব সম্পর্কে কি বর্তমান সরকার এবং নির্বাচন কমিশন শ্রদ্ধাশীল নয় বলে কি তারা মনে করে?  যদি এটা মনে হয়ে থাকে তাহলে তারা ভুলের উপর দাঁড়িয়ে আছেন। বিশ্বনেতা ও  বাংলাদেশের রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনাকে গণতন্ত্রের মানসকন্যা হিসেবে এ দেশের মানুষ তাকে ডাকেন। বিএনপি-জামায়াত যখন ক্ষমতায় ছিল, তখন শেখ হাসিনার জনসভায় গ্রেনেড মেরে তাকে হত্যা করার চেষ্টা করা হয়েছে। আল্লাহর অশেষ মেহেরবানীতে তিনি সে যাত্রা রক্ষা পেলেও অনেক মানুষ নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অসংখ্য মানুষ। তারপরেও তিনি কোন জীবনের পরওয়া না করে  দেশবাসীর ভাত এবং ভোটের অধিকার ফিরিয়ে দিতে জীবনবাজী রেখে লড়াই করেছেন।যা আজও চলমান। 

পশ্চিমা দেশের ৯ কূটনীতিককে আমরা কড়া ভাষায় জানাতে চাই, এই বাংলার মাটিতে কারা গণতন্ত্রের গলাটিপে ধরার চেষ্টা করেছে, আর কারা সেনাশাসকদের ক্ষমতায় আনার চেষ্টা করেছে, সেই পাঠ বিবৃতিদাতা কূটনীতির নিতে হবে। বিএনপি নামক দলটি আমাদের স্বাধীনতার শক্র, স্বাধীনতা বিরোধী জামায়াতকে নিয়ে রাজনীতি করে। বিএনপি-জামায়াত যে একাকার এতে কারো কোনো সন্দেহ নেই । ফলে স্বাধীনতা বিরোধী বিএনপি-জামায়াত বাংলার বুকে আর কখনো ক্ষমতায় দেখতে চায়না দেশের মুক্তিযুদ্ধে বিশ্বাসী জনগণ। এখন মানুষ সজাগ ও সচেতন। সেনা ছাউনিতে জন্ম নেওয়া বিএনপি গণতন্ত্রের ভাষা শেখেনি। গণতন্ত্র কিভাবে আত্মস্থ করতে হয় তা এখনো জানে না। দলটির চরিত্রে রয়েছে একনায়কতন্ত্র ও সামরিক গন্ধ।

পরিশেষে বলতে হচ্ছে, আপনারা শিষ্ঠাচার শিখুন, কূটনৈতিক পরিভাষা আত্মস্থ করুন। অন্য দেশের অভ্যন্তরীন বিষয়ে নাক গলানোর দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করুন। যদি আপনারা তা করতে ব্যর্থ হন তাহলে পররাষ্ট্র মন্ত্রীর ভাষায় বলতে হয় কোড অবকন্ট্রাক্ট মেনে চলতে না পারলে পাততাড়ি গুছিয়ে নিজ দেশে ফেরৎ যান। অদূর ভবিষ্যতে পশ্চিমা বিদেশি কূটনীতিকদের এই প্রভূ সূলভ  আচরন স্বাধীনতা প্রিয় বাঙালিরা মেনে নেবে না। পশ্চিমা দেশকে আমরা নিজেদের বন্ধু মনে করি, কিন্তু ভাবেই তাদের প্রভূ হয়ে ওঠার মানসিকতাকে আমরা সমর্থন করি না। তারা বাংলাদেশের উন্নয়নে এবং এ দেশের মানুষের প্রতিটি মঙ্গলসাধনে পাশে থাকবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। 

Ads
Ads