রোহিঙ্গা গণহত্যাকারীরা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পাক

  • ৫-ফেব্রুয়ারী-২০২০ ০৪:৪৭ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

রাখাইন থেকে রোহিঙ্গাদের তাড়িয়ে দিয়ে মিয়ানমার মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে কি-না এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)। গত মঙ্গলবার ঢাকায় সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান বাংলাদেশে সফররত আইসিসি প্রতিনিধি দলের প্রধান ফাসিকো মোচোচোকো। এতে মিয়ানমারের ওপর আরও চাপ বাড়বে। 

মিয়ানমার সরকার বেশ কয়েক বছর ধরে রাখাইনের রোহিঙ্গাদের ওপর নির্বিচারে গণহত্যা চালিয়ে চরম মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে। এ ঘটনা সংঘটিত হওয়ায় লাখ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে বাংলাদেশের কক্সবাজারে। এতে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা রাখাইন ছেড়ে এসে আশ্রয় নেওয়ায় চরম বিপদে রয়েছে বাংলাদেশ। এত উদ্বাস্তু মানুষের ভরণপোষণের চাপ বাংলাদেশ আর সহ্য করতে পারছে না। ফলে রোহিঙ্গাদের গণহত্যার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তির দাবি নিশ্চিত করাটাই এখন জরুরি। 

কয়েকদিন আগে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালত রোহিঙ্গা গণহত্যার জন্য রাষ্ট্র হিসেবে মিয়ানমারের ব্যাপারে দিকনির্দেশনা দিয়ে রায় দিয়েছেন। সেই রায়ের পরে আইসিজিতে রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলার পর এবার আইসিজি মানবতাবিরোধী অপরাধের আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করা যা অগ্রগতির স্বাক্ষর দিচ্ছে। সত্যিকার অর্থেই যারা গণহত্যা চালিয়েছে তাদের কঠোর শাস্তির মুখোমুখি দাঁড় করানো সম্ভব হবে। 

মিয়ানমারে দীর্ঘদিন ধরে সামরিক জান্তা সরকার শাসন কার্য চালিয়েছে। সু চির রাজনৈতিক দল দেশটিতে সরকার গঠন করায় বাংলাদেশসহ অনেক দেশই আশা করেছিল রোহিঙ্গাদের উপর নিষ্ঠুর গণহত্যা আর চালানো হবে না। তাদের বসত ঘর-বাড়ি পুড়িয়ে রাখাইন থেকে বিতাড়ন বন্ধ হবে। এবং যেসব রোহিঙ্গা নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচার জন্য বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে- তাদেরকে দ্রুতগতিতে মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এটা তো হয়নি বরং সু চির সরকার রোহিঙ্গাদের ওপর আরো নির্যাতন, গণহত্যা, ধর্ষণ বহুমাত্রায় বাড়িয়ে দেয়। যে কারণে দেখা যায়- সু চির রাজনৈতিক সরকারের সময়ে বাংলাদেশে বেশি পরিমাণ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। এই যে মানবতাবিরোধী ঘটনা তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়ার মতো নয়। রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক হওয়ার পরেও দেশটি বার বার বলে এসেছে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশি। এই যে অপপ্রচার এটাও অপরাধের সামিল বলে আমরা মনে করি। 

গতকাল মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলনে ফাকিসো মোকোচোকো বলেন, ‘আমরা এখন বলতে পারব যে, রাখাইনে নিরীহ রোহিঙ্গারা গণহত্যার শিকার। মিয়ানমার নিজেই অপরাধের বিষয়টি স্বীকার করেছে। এখন আমাদের কাছে প্রশ্ন হচ্ছে কে অপরাধ করেছে, আর কেইবা অপরাধে সহায়তা দিয়েছে? আমরা প্রমাণ সংগ্রহের চেষ্টা করছি, যাতে নির্দিষ্টভাবে বলতে পারি কোন ব্যক্তি বা ব্যক্তিরা অপরাধ করেছে। আইসিজেতে মিয়ানমার বলেছে, কিছু জেনারেল ও অন্যরা হয়তো অপরাধ করেছে এবং তাদের বিচার করা হবে। আইসিসি যদি এ বিষয়ে কোনো তথ্য পায়, তবে সেটি তারা বিবেচনায় নেবে।’

আইসিসির প্রতিনিধি ফাসিকো মোচোচোকোর বক্তব্যে অনেক কিছুই পরিষ্কার হয়েছে। অপরাধ সংঘটনের পরে মিয়ানমার সেটি স্বীকার করে নেওয়ায় দেশটির উচিত আইসিসির কাজে সহায়তা করা। এটি করলে তারা বুদ্ধিমানের কাজ করবে এবং এই সহায়তা নিশ্চিত হয় এ ব্যাপারে দেশটির যেসব বন্ধুরাষ্ট্র রয়েছে তাদেরও সহায়তায় এগিয়ে আসতে হবে। বিশেষ করে চীনকে এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। মিয়ানমারের সঙ্গে চীনের রয়েছে সবচেয়ে ঘনিষ্ট সম্পর্ক। এই সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে চীনের উচিত হবে আইসিসির কাজে সু চিকে যাতে সহায়তা করে সে ব্যাপারে রাজি করানো। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে আইসিসির কাজে মিয়ানমার সহায়তা করছে না। নানা ছলছুতোয় দেশটি রোহিঙ্গা গণহত্যার বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে, যা তাদের নির্বুদ্ধিতার সামিল। 

মিয়ানমারের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক ভালো থাকায় রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচার কতটুকু চীন চায়, এ ব্যাপারে অনেকের মনে সন্দেহ রয়েছে। কিন্তু চীনা সরকারকে ভেবে দেখতে হবে বাংলাদেশের সঙ্গেও তাদের নিবিড় ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। তাদের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য সম্পর্ক বিরাজমান। ফলে বাংলাদেশের স্বার্থের কথাও চীনা সরকারকে ভাবতে হবে। বছরের পর বছর রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে যাওয়া বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব নয়।  রোহিঙ্গাদের কারণে ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের অর্থনীতির উপর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। চীনের উচিত হবে বাংলাদেশের স্বার্থকে দেখা। এবং রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা। 
পরিশেষে আমরা বলতে চাই, রোহিঙ্গা গণহত্যার সুষ্ঠু বিচার সম্পন্ন হোক। মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ড যারা চালিয়েছে, তারা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পাক। এই বিচারকার্যে আইসিসির কোনোভাবেই যেন শৈথিল্য না দেখায়। রোহিঙ্গা গণহত্যাকারীরা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পাক।

Ads
Ads