কাঙ্ক্ষিত ভোটার হাজির করার দায়িত্ব সবার

  • ৬-ফেব্রুয়ারী-২০২০ ০৬:২৩ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

গণতন্ত্রকে শক্ত ভিত্তি দিতে সকলের অংশগ্রহণের নির্বাচন অপরিহার্য। এটি সম্ভব করা না গেলে গণতন্ত্র কখনই মজবুত অবস্থানে দাঁড়াতে পারবে না। গণতন্ত্রের এই দুরবস্থা ঘটলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে গণতন্ত্র। এদেশে ঘাপটি মেরে থাকা লোকেরা নির্বাচনের বিরুদ্ধে নানা অপ্রচারে লিপ্ত হবে। অতীতে তারা নির্বাচনের নানা দোষত্রুটিকে বড় করে দেখানোর চেষ্টা করেছেন। সবার জানা যে, ঘাপটি মেরে থাকা এসব লোক দেশে সুষ্ঠু ও অবাধ-নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্পন্ন হোক সেটাও চায় না। এদের কথা মনে রেখেই প্রতিটি নির্বাচনের গুরুত্বকে উপলব্ধি করতে হবে। 

গত ফেব্রুয়ারি ঢাকা দুই সিটির নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। এ নির্বাচনের রেশ এখনো কাটেনি। চলছে তার মূল্যায়ন। এটা গণতন্ত্রের বিকাশের জন্য একটি শুভ লক্ষণ বলে আমরা মনে করি। গণতন্ত্রের রীতি হলো- নানা মতের মানুষের মত প্রকাশের সুযোগ করে দেওয়া। সেই মত কারোর বিরুদ্ধে গেলেও ক্ষিপ্ত হওয়া যাবে না। গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে বিপক্ষ মতামতকে শুধরে দিতে হবে। বাংলাদেশের গণতন্ত্র শক্তিশালী ভিত্তি পাওয়ায়- এই দিকটি সুন্দরভাবে প্রস্ফুটিত হতে দেখা যায়। সদ্য সমাপ্ত ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনের মূল্যায়ন দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বেশ জোরেসোরে চলছে। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি নিজেদের আত্মসমালোচনায় লিপ্ত রয়েছে। আমরা মনে করি এটাও একটি শুভ লক্ষণ, ভালো দিক। আত্মসমালোচনা না করলে নিজেদের ভুল-ত্রুটি ধরা পড়বে না। এবং আগামীর পথকে সুগম করা সম্ভব হবে না। 

তবে ঢাকা দুই সিটির নির্বাচন নিয়ে কিছু কিছু মহল উদ্দেশ্যমূলক কথাবার্তা বলে চলেছেন। তারা নির্বাচনের আগে যেমন বলেছেন, নির্বাচনের পরেও বলে যাচ্ছেন। তাদের কথাবার্তার ধরন দেখে মনে হতে পারে তারা প্রকৃত গণতন্ত্রমনা। কিন্তু গভীরভাবে উপলব্ধি করলেই বোঝা যাবে তারা গণতন্ত্রবিনাশেই তাদের ছুরিতে সারাক্ষণ শান দিতে ব্যস্ত। এই মহলটি তৃতীয় একটি শক্তি ক্ষমতায় উপবিষ্ট হোক তার জন্য নানান ধরনের কূটকৌশল বিস্তার করে চলেছেন। ফলে এদের বিষয়টি মাথায় রেখে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে সচেতন থাকতে হবে। অতীতের মাইনাস টু থিয়োরি কোনোভাবেই দেশের উপর চেপে বসতে দেওয়া যাবে না।

প্রশ্ন উঠেছে, ১  ফেব্রুয়ারির ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনে ভোটারদের উপস্থিতি কম ঘটল কেন? এটি যথার্থ একটি বিষয়। এটা নিয়েই আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে সরব আলোচনা চলছে। দুই দলের দলীয় লোকজনই কেন ভোট দিতে কেন্দ্রে এলেন না এ প্রশ্নও এখন মুখে মুখে? আমাদের পর্যবেক্ষণ,- দুই সিটির নির্বাচনের আগে বিএনপি এবং তাদের অনুগত লোকজন ইভিএমে ভোট গ্রহণের ব্যাপারটি নিয়ে প্রচণ্ড অপ্রচারে লিপ্ত হয়। অনেক ভোটার এই অপ্রচারের শিকার। ভোটাররা মনে করেছেন, ইভিএমে ভোট দেওয়াটা কষ্টকর হবে। এ দেশের মানুষের মধ্যে এমনিতে প্রযুক্তিগত জ্ঞান কম । তারা প্রযুক্তির ভয়ে ভোট দিতে উৎসাহ পাননি। কিন্তু নির্বাচনে যারা ইভিএমে ভোট দিয়েছেন, তারা দেখেছেন- কত সহজেই ইভিএমে ভোট দেওয়া যায়। এবং এটি ভোটারের ভোটের সুরক্ষা হয় দারুণভাবে। 

আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণ করার ব্যাপারে বিএনপির অনীহা রয়েছে এ নিয়ে অনেকেই দলটির বিরুদ্ধে সমালোচনায় সোচ্চার। যারা সোচ্চার তারা যে মিথ্যা অজুহাত নিয়ে দলটির বিরুদ্ধে সোচ্চার নয়, সেটি পরিষ্কার হয়ে  গেছে। সারা বিশে^ই যেখানে ইভিএমে ভোটগ্রহণ বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে, সেখানে দলটি ইভিএমের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। অবশ্য তারা ইভিএমে ভোটগ্রহণ বন্ধ করতে পারেনি। নির্বাচন কমিশন ঠিকই ইভিএমে ভোট নিয়েছে। ইভিএম ভীতি ভোটারদের মধ্যে ছড়িয়ে না পড়লে আমরা মনে করি কেন্দ্রে আরও ভোটারের সমাগম ঘটত। আগামী যে কোনো নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অনুগত ভোটারদের কেন্দ্রে আসাটাকে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। কারণ দেশের সিংহভাগ মানুষই এ দলটির সমর্থক। বিএনপি জনবচ্ছিন্ন দলে পরিণত হওয়ায় তার অবস্থান নড়বড়ে। ঢাকার দুই সিটির নির্বাচনে বহু ভোট কেন্দ্রে বিএনপির এজেন্টদের খুঁজে পাওয়া যায়নি। কিন্তু এনিয়ে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা চালিয়েছে দলটির নেতা এবং তাদের অনুগামীরা। 

মানুষের মধ্যে বিএনপির জনসমর্থন ও ভিত্তি এখন এতটাই দুর্বল যে আগামী বছরগুলোতে এ দলটির টিকিটিও খুঁজে পাওয়া যাবে কি-না সন্দেহ রয়েছে। তারপরেও দলটির বোধোদয় ঘটছে না। কিন্তু তাদের কথাবার্তায় মনে হবে মানুষের মধ্যে তাদের প্রভাব অনেক গভীরে প্রোথিত। এই ভুল ধারণা নিয়েই দলটি বিজয়ী হওয়ার স্বপ্ন দেখেন। ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনে হেরে গিয়ে তারা নানা বিতর্কিত কথা শুরু করেছেন। এ ব্যাপারে গতকাল বুধবার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘ঢাকা সিটি করপোরেশনের নির্বাচন সুষ্ঠু ও কারচুপি মুক্ত হয়েছে। আসলে নির্বাচনে হেরে গেলে ফল কেউই মানতে চায় না। হেরে গেলে হার কি কেউ মেনে নেন? বিএনপিও মানছে না। নির্বাচনে হেরে গেলে ফলাফল কেউই মানতে চায় না। ইভিএমএ কারচুপির কোনো সুযোগ নেই। বিএনপির মহাসচিব হিসেবে নিজে কোনো সাফল্য দেখাতে পারেননি বলেই, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কারচুপির অভিযোগে দুই সিটির নির্বাচনের ফল বাতিল করে নতুন নির্বাচন দেওয়ার দাবি করছেন। ইভিএমের মাধ্যমে এই নির্বাচনে কারচুপির বা ফল বদলে দেওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। হেরে যাওয়ার কারণেই বিএনপি প্রার্থীরা ফল প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাদের সব আহ্বান জনগণ প্রত্যাখ্যান করবে। নির্বাচনে কোনো কারচুপির প্রমাণ পর্যবেক্ষকরা দিতে পারেননি এমনকি বলেনওনি। স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে বড় দাগের সংঘাত হয়, এবার বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া বড় ধরনের কোনো সংঘাত হয়নি। নির্বাচন ছিল কারচুপি ও জালিয়াতি মুক্ত। ফখরুল সাহেব কেন ফল প্রত্যাখ্যান করলেন জানি না। তাদের উদ্দেশ্য কি ছিল? কেন্দ্র দখল করে জালিয়াতি করে জেতার। এটা সম্ভব না, এই মেশিনে কারচুপি জালিয়াতির সুযোগ নেই। ইভিএমে ভোট করাই হয়েছে কারচুপি জালিয়াতি যেন না হয় সেজন্য। নির্বাচনে তাদের লোক দেখলাম না। মিছিলে তাদের অনেক লোক ছিল, নির্বাচনের দিন গেল কোথায়।’ ঢাকার দুই সিটির নির্বাচন সংক্রান্ত ব্যাপারে মোক্ষম কথাটিই ওবায়দুল কাদের বলেছেন। আসলে বিএনপি বর্তমান কর্মকাণ্ডে তাদের জনসমর্থন আরও কমবে। তারা এমন সব আজগুবি গল্প ফাঁদে যা দিয়ে আর সাধারণ মানুষকে বোকা বানানো যায় না। এ থেকে দলটি কবে বেরিয়ে আসবে এটাই ভাবার বিষয়। 

পরিশেষে আমরা বলতে চাই, একটি ভালো নির্বাচনকে খারাপভাবে উপস্থাপনার মধ্যে কোনো কৃতিত্ব নেই। হেরে যাওয়ার মধ্যেও খারাপ কিছু নেই। বিএনপি কেন হেরে গেল এটা তাদের গভীরভাবে চিন্তা করতে হবে। স্বাধীনতা বিরোধী ঘাতকচক্র জামায়াতকে নিয়ে তাদের দীর্ঘদিনের অভিযাত্রায় যে ক্ষতটি সৃষ্টি হয়েছে, নানা সময়েই তা পরিলক্ষিত হয়েছে। নির্বাচনে বড় আকারের পরাজয়ের মধ্যদিয়ে সেই ক্ষতটি সবার চোখের সামনে উন্মোচিত হলো। ঢাকা রাজধানীর দুই সিটির ভোটাররা জামায়াতকে দোসর করে নিয়ে চলার পক্ষে ছিল না। অতীতে ঢাকার মেয়র হিসেবে বিএনপির লোক ছিল। সেই মেয়ররা ক্রমাগত দুর্নীতি করে টাকার পাহাড় বানিয়েছে। রাজধানীর উন্নয়নে কোনো কাজ করেনি। তাহলে দুই সিটিতে বিএনপির লোককে ভোটররা কেন ভোট দিয়ে মেয়র বানাবে-এটি কিন্তু ভোটারদের চেতনায় কাজ করেছে।

Ads
Ads