বঙ্গবন্ধুর বই ‘আমার দেখা নয়াচীন’ ৯দিনে যার বিক্রি ২০ হাজার

  • ১১-ফেব্রুয়ারী-২০২০ ০২:১৪ অপরাহ্ন
Ads

::আরিফুর রহমান ::
অমর একুশে গ্রন্থমেলার ৯ম দিন ছিল গতকাল সোমবার। গ্রন্থমেলায় প্রকাশ পেয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বই ‘আমার দেখা নয়াচীন’। প্রথম দফায় ২০ হাজার কপি ছাপানো হয় এ বই। কিন্তু বিপুল কাটতির মুখে মেলার ৯ দিনের মাথায়ই ওই ২০ হাজার কপি বিক্রি হয়ে গেছে। অনেকেই বইটি কিনতে গিয়ে না পেয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন। মেলার উদ্বোধনী দিন এ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেন বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বইটি প্রকাশ করেছে বাংলা একাডেমি।

বিকেলে মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে বাংলা একাডেমির প্যাভিলিয়নে দেখা যায়, আমার দেখা নয়াচীন বইটি সংগ্রহের জন্য বেশ কয়েকজন জড়ো হয়েছেন। কিন্তু স্টল থেকে জানানো হচ্ছে, বইটির প্রথম দফার মুদ্রণ শেষ। এ বইয়ের ব্যাপারে আগ্রহীদের একজন সেন্ট্রাল রোড থেকে আগত আহসান ইব্রাহীম। বই না পাওয়ায় হতাশা ব্যক্ত করে তিনি ভোরের পাতাকে বলেন, ‘সোমবারই প্রথম মেলায় এলাম। এবার প্রথমেই কেনার ইচ্ছা ছিল বঙ্গবন্ধুর ‘আমার দেখা নয়াচীন’ বইটি। কিন্তু এসে শুনলাম, বইটি শেষ হয়ে গেছে’।


বাংলা একাডেমির প্যাভিলিয়নের এক বিক্রয়কর্মী ভোরের পাতাকে বলেন, ‘প্রথম দিন থেকেই বইটির বিষয়ে পাঠকের ব্যাপক আগ্রহ। সোমবার বিকেলেই এর প্রথম দফার মুদ্রণ শেষ হয়ে গেছে। তবে মঙ্গলবার (১১ ফেব্রুয়ারি) থেকে আবারও বইটি পাওয়া যাবে’। বাংলা একাডেমির বিক্রয়, বিপণন ও পুনর্মদ্রণ বিভাগের পরিচালক ড. জালাল আহমেদ এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘বইটির ব্যাপক পাঠকচাহিদা সৃষ্টি হয়েছে। আমরা প্রথম দফায় বিশ হাজার কপি প্রকাশ করেছি। সব বিক্রি হয়ে গেছে। তবে আগামীকাল (আজ) থেকে আবারও বইটি পাওয়া যাবে’।

১৯৫২ সালে এক শান্তি সম্মেলনে যোগ দিতে চীন সফর করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। পরবর্তী সময়ে ওই সফর নিয়ে তিনি যেসব লেখা লেখেন, তার সংগ্রহই ‘আমার দেখা নয়াচীন’ বইটি। ২০০ পৃষ্ঠার এ বইয়ের মূল্য ৪০০ টাকা। মেলায় ৩০ শতাংশ কমিশনে বইটি মিলছে ২৮০ টাকায়।

স্টলে স্টলে হরেক রকম বইয়ের সম্ভার :অমর একুশে গ্রন্থমেলায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান হরেক রকম বই নিয়ে হাজির হয়েছে। এর মধ্যে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আছে সৃজনশীল সব প্রকাশনা সংস্থা। তবে বইয়ের সম্ভারে কোনো অংশেই পিছিয়ে নেই বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ। সেখানে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানকে স্টল ও প্যাভিলিয়ন দেওয়া হয়েছে। বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে শিশু একাডেমির স্টল ঘুরে দেখা যায়, সেখানে বাচ্চাদের পাঠ উপযোগী অনেক বই রয়েছে।

এর মধ্যে ‘শিশু বিশ্বকোষ’, ‘বাংলা অভিধান’, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার লেখা ‘আমাদের ছোট রাসেল সোনা’, ‘ছোটদের বিজ্ঞান কোষ’, ‘মুক্তিযুদ্ধের কিশোর গল্প’ বেশ ভালো বিক্রি হয়েছে। ইসলামী ফাউন্ডেশনের বেশি বিক্রীত বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘বুখারি শরিফ’, ‘আখলাকুল নবী’, ‘আল কোরআনুল করিম’, ‘নক্ষত্রতুল্য সাহাবায়ে কারাম’। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর স্টলে আছে পরিসংখ্যান বিষয়ক নানা বই। জাতীয় জাদুঘরে থেকে প্রকাশিত ‘আলোকচিত্রে সেকালের ঢাকা’, ‘বাংলাদেশের দারুশিল্প’, ‘ট্রেডিশনাল জামদানী’ বইগুলোর কাটতি ভালো। স্পর্শ ব্রেইল প্রকাশ করেছে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য ব্রেইল সংস্করণে নতুন ১৫টি বই। মেলা চলাকালে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীরা এখানকার যে কোনো বই পড়তে পারেন।

বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে আছে বঙ্গবন্ধু বিষয়ক নানা বই। সেন্টার ফর রিচার্স অ্যান্ড ইনফরমেশন প্রকাশ করেছে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গ্রাফিক নভেল ‘মুজিব’র সপ্তম খণ্ড। এবারের গ্রাফিক নভেলটির নাম ‘অ্যাকশন ডে’। উন্মাদ এনেছে তাদের মাসিক রম্য ম্যাগাজিনের ৩৫০তম সংখ্যা। কবি নজরুল ইনস্টিটিউটে পাওয়া যাচ্ছে নজরুল বিষয়ক নানা বই।

ডাক বিভাগের স্টলে রয়েছে হরেক রকমের ডাকটিকিট, পোস্টকার্ড, বিশেষ খাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশনা সংস্থায় রয়েছে মূলত গবেষণা বিষয়ক বই। বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটিতেও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ সব বই। তাদের প্রকাশিত বইগুলোর মধ্যে বাংলাপিডিয়া, জুনিয়র বাংলাপিডিয়া, বাংলাদেশের ইতিহাস ভালো বিক্রি হয়েছে।

হুইলচেয়ারে বইমেলায় মুহিত : মাগরিবের পর মেলার ভেতর ইট বালির বানানো রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতেই চোখে পড়ল একটি হুইলচেয়ার নিয়ে আসছেন দুই তরুণ-তরুণী। একটু কাছাকাছি আসতেই হুইলচেয়ারে বসা ব্যক্তির চেহারা স্পষ্ট হলো- তিনি সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত। দুজন স্বেচ্ছাসেবী হুইল চেয়ার নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। মুক্ত মঞ্চের কাছাকাছি এসে স্বেচ্ছাসেবী দুজন একটি নির্দিষ্ট প্রকাশনী খুঁজছেন। এক ব্যক্তি তাদের প্রকাশনী দেখিয়ে দিলেন। হুইলচেয়ারে বসা মুহিতকে দেখে দু’পাশের লোকজন রাস্তা ছেড়ে দিচ্ছিলেন। হুইলচেয়ার এসে থামলো সময় প্রকাশনের প্যাভিলিয়নের সামনে। স্টল থেকে কয়েকজন বেরিয়ে এসে সাবেক অর্থমন্ত্রীকে ধরে স্টলের ভেতরে নিয়ে বসালেন। কিছুক্ষণ পরেই পরিবারের সদস্যরা চলে এলেন।
পরিবারের এক সদস্য এ প্রতিবেদককে জানালেন, বইমেলার সময় উনি (মুহিত) বাসায় থাকতে চান না, একবার হলেও মেলায় আসবেনই। তাই আমাদের সঙ্গে নিয়ে এলাম। কিন্তু মেলার ভেতরে কীভাবে চলাফেরা করবো সেটাই ভাবছিলাম, তখনই স্বেচ্ছাসেবীরা এগিয়ে এলেন। স্বেচ্ছাসেবীরা থাকায় অনেক উপকার হলো। এবারের বইমেলায় আবুল মাল আব্দুল মুহিতের একটি বই আসার কথা ছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত লেখা সম্পূর্ণ না হওয়ায় সেটা আসছে না- এমনটাই জানালেন সাবেক মন্ত্রীর এক স্বজন। কথা বলে জানা গেল, বইমেলার প্রতি তীব্র অনুরাগ থেকে প্রতি মেলাতেই ছুটে আসেন প্রবীণ এই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। বইমেলা থেকে কিছু পছন্দের বই কিনে তবেই ফিরবেন বাসায়।

মূলমঞ্চের আয়োজন : বিকেলে গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় দিব্যদ্যুতি সরকার রচিত বঙ্গবন্ধুর কারাজীবন শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য রাশিদ আসকারী। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন এডভোকেট সাহিদা বেগম ও ড. আশফাক হোসেন। লেখকের বক্তব্য প্রদান করেন দিব্যদ্যুতি সরকার। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আবুল মোমেন।

আলোচকরা বলেন, গণমানুষের মুক্তি-আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে পৃথিবীতে যে ক’জন হাতে গোনা মানুষ কায়েমি শোষকদের অধীনে দীর্ঘ কারাভোগ করেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাদের মধ্যে অন্যতম। পাথরের দেয়াল এবং লোহার গরাদ অতিক্রম করে তিনি একটি স্বাধীন দেশ স্থাপন করেছেন পৃথিবীর মানচিত্রে। লেখক দিব্যদ্যুতি সরকার বঙ্গবন্ধুর কারাজীবন গ্রন্থে বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ কারাজীবনের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত বহুমাত্রিক জ্যোতির্ময় বঙ্গবন্ধুর নানাবিধ সত্তা, যেমন, মানুষ বঙ্গবন্ধু, রাজনীতিবিদ বঙ্গবন্ধু, লেখক বঙ্গবন্ধু ইত্যাদি বিষয় আবিষ্কারের প্রয়াস পেয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর বৈচিত্র্যময় কন্টকাকীর্ণ জীবনের এক দুর্যোগপূর্ণ অধ্যায় তার কারাজীবন, সমকালীন ইতিহাসের আলোয় তার বয়ান এবং অন্তর্বয়ান আলোচ্য গ্রন্থকে মুজিব জন্মশতবর্ষের এই সময়ে খুবই প্রাসঙ্গিক।

আলোচকরা আরও বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার জীবনের এক তৃতীয়াংশ সময়ই কারাগারে কাটিয়েছেন। আত্মত্যাগী এই মহান নেতার আপোষহীন সংগ্রামের কারণেই বাঙালি আত্মপরিচয়ের সংকটকে কাটিয়ে বিশ্বের বুকে একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। লেখক দিব্যদ্যুতি সরকার তাঁর রচিত বঙ্গবন্ধুর কারাজীবন গ্রন্থে বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ বৈচিত্র্যময় কারাজীবনের অভিজ্ঞতাকে উপস্থাপন করেছেন। আমাদের তরুণ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী জীবনের ইতিহাস তুলে ধরার ক্ষেত্রে এ গ্রন্থটি তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সভাপতির বক্তব্যে আবুল মোমেন বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর জীবন ইতিহাস পর্যালোচনা করতে হলে তার জেল জীবনের প্রেক্ষাপট ও অভিজ্ঞতাও আমাদের বিবেচনায় আনতে হবে। বারবার কারাবরণ ও আপোষহীন সংগ্রামের মাধ্যমেই বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের উত্তরণ ঘটে এবং তিনি গণমানুষের আশা-ভরসার প্রতীকে পরিণত হন। বঙ্গবন্ধুর কারাজীবনের পটভূমিতে রচিত দিব্যদ্যুতি সরকারের বঙ্গবন্ধুর কারাজীবন গ্রন্থটিতে জাতির পিতার জীবন ও ভাবনার অনেক গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে যা এই মহান বাঙালির সামগ্রিক মূল্যায়নে ভূমিকা রাখবে’।

কবিকণ্ঠে কবিতা পাঠ করেন কবি ওবায়েদ আকাশ, মতিন বৈরাগী, আলতাফ শাহ্নেওয়াজ এবং স্নিগ্ধা বাউল। আবৃত্তি পরিবেশন করেন আবৃত্তিশিল্পী মাহিদুল ইসলাম, সুপ্রভা সেবতী, জি এম মোর্শেদ। নৃত্য পরিবেশন করেন লায়লা হাসানের পরিচালনায় নৃত্য সংগঠন ‘নটরাজ’-এর নৃত্যশিল্পীবৃন্দ। সেলিম রেজার পরিচালনায় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘সংস্কৃতি মঞ্চ’-এর পরিবেশনা। যন্ত্রাণুষঙ্গে ছিলেন জয় সিংহ রায় (তবলা)। আজ লেখক বলছি অনুষ্ঠানে নিজেদের নতুন বই নিয়ে আলোচনা করেন কবি টোকন ঠাকুর, কবি সৈয়দ তারিক, কথাশিল্পী সাগুফতা শারমীন তানিয়া এবং কবি আখতারুজ্জামান আজাদ।

নতুন বই : বাংলা একাডেমির জনসংযোগ উপবিভাগ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গতকাল সোমবার মেলায় নতুন বই এসেছে ১৭৯টি।

আজকের মেলা : অমর একুশে গ্রন্থমেলার আজ ১০ম দিন। মেলা চলবে বেলা ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। বিকাল ৪ টায় গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে মোহাম্মদ আলী খান রচিত ডাকটিকিট ও মুদ্রায় বঙ্গবন্ধু শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবে আতাউর রহমান। আলোচনায় অংশগ্রহণ করবে শ্যামসুন্দর সিকদার ও ইকরাম আহমেদ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবে ফজলে কবির। সন্ধ্যায় রয়েছে কবিকণ্ঠে কবিতাপাঠ, আবৃত্তি এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

Ads
Ads