রোহিঙ্গা পাচার ঠেকাতে হবে 

  • ১৩-ফেব্রুয়ারী-২০২০ ০৫:২৮ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::
 
সম্প্রতি প্রকাশিত একটি সংবাদে আমরা চমকে উঠেছি। যেখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের কক্সবাজারে উদ্বাস্তু হিসেবে আশ্রয় নেওয়া মিয়ানমারের রোহিঙ্গারা জলপথে অবৈধভাবে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার সময় ট্রলার ডুবিতে ১৫ জনের করুণ মৃত্যু হয়েছে। একটি সংঘবদ্ধ চক্র গত মঙ্গলবার রোহিঙ্গাদের প্রলোভনে ফেলে ট্রলারে করে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে যাত্রা করেছিল। গণমাধ্যমের খবরে জানা যায়, প্রলোভনের শিকার রোহিঙ্গা যাত্রীর সংখ্যা ছিল ১৩৮ জন। ভোরে সেন্টমার্টিন দ্বীপের অদূরে তাদের বহনকরা ট্রলারটি পাথরের সঙ্গে ধাক্কা লেগে তলা ফেটে ডুবে যায়। এতে ১৫জনের সলিল সমাধি ঘটে। ১৫ জন রোহিঙ্গার এই করুণ মৃত্যু কারোরই কাম্য নয়। মৃতদের মধ্যে অনেক শিশুও রয়েছে। যাদের কারণে এই দুর্ঘটনা তাদের আইনের আশ্রয় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবি। মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের নিজস্ব মাতৃভূমি। কিন্তু কয়েক বছর ধরে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের উপর গণহত্যা-নির্যাতন-ধর্ষণ চালিয়ে তাদেরকে নিজ বাসভূমি থেকে উচ্ছেদ করে তাদেরকে ভিন দেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য করেছে। মিয়ানমারের এই আচরণ যা সভ্য সমাজের জন্য কলঙ্কের। জীবন বাঁচাতে লাখ লাখ হতভাগ্য রোহিঙ্গা বাংলাদেশের কক্সবাজারে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। 

বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া উদ্বাস্তু রোহিঙ্গাদের ঘিরে কক্সবাজার এলাকায় নানা চক্র সক্রিয় রয়েছে। রোহিঙ্গাদের বিপথগামী করে অর্থ উপার্জনের ফন্দি ফিকির তারা বের করেছে। তারই অংশ হিসাবে সংঘবদ্ধ চক্র মালয়েশিয়ায় চাকরি ও সুন্দর ভবিষ্যতের লোভ দেখিয়ে ১৩৮ জন রোহিঙ্গাকে জলপথে সেখানে নেওয়ার চেষ্টা চালায়। 
গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে জানা গেছে, টেকনাফের নোয়াখালীপাড়া ঘাট দিয়ে রোহিঙ্গাদের ট্রলারে তোলা হয়। দালাল চক্রের লোকজন তাদের উখিয়া-টেকনাফের বিভিন্ন ক্যাম্প থেকে এনে এই ঘাটের কাছে পাহাড়ে ছোট একটি বাড়িতে রাখে। সেখান থেকে গত সোমবার রাতের বিভিন্ন সময়ে তাদের ট্রলারে তোলা হয়। ছোট ছোট দলে ভাগ করে রোহিঙ্গাদের প্রথমে ছোট নৌকায় তোলা হয়। এরপর ছোট নৌকা থেকে তুলে দেওয়া হয় বড় ট্রলারে।

আমাদের প্রশ্ন হলো, কক্সবাজারের স্থানীয় প্রশাসনের চোখের সামনে রোহিঙ্গাদের বিদেশে পাচারের চেষ্টা চালানোর পরেও স্থানীয় প্রশাসন এটি টের পেলেন না, এটি আমাদের কাছে অবিশ^াস্য। কিভাবে সেটি সম্ভব হলো সেটিও এখন চিন্তার বিষয়?  আমরা মনেকরি এটি প্রশাসনের উদাসীনতা। এই ঘটনা প্রমাণ করে দালালচক্রের সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃৃঙ্খলারক্ষাকারীদের যোগাযোগ রয়েছে। প্রশাসনের অজান্তে এমন ঘটনা ঘটতে পারে তা বিশ^াসযোগ্য হতে পারে না। নিশ্চয় উভয়ের মধ্যে যোগসূত্র রয়েছে। এই যে ১৫ জন রোহিঙ্গার সলিল সমাধি হলো এর দায় কে নেবে ? যে দালাল চক্রের খপ্পরে পড়ে ১৩৮ জন রোহিঙ্গা মালয়েশিয়ায় যাওয়ার উদ্যোগ নেয় এবং তার মধ্যে ১৫ জনের মৃত্যু হয়-ঘটনাটি আন্তর্জাতিক গণামাধ্যমে প্রচার পেয়েছে। এতে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি অনেকটাই প্রশ্নের ভেতরে পড়েছে যা অস্বীকারের উপায় নেই। আমরা মনে করি দেশীয় দালাল চক্রের হোতাদের দ্রুত শাস্তির আওতায় এনে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। উদ্বাস্তু রোহিঙ্গাদের ঘিরে যেসব দলাল ও সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় রয়েছে তাদেরকে দ্রুত আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি।

দালাল চক্রকে শাস্তির আওতায় আনা না গেলে ভবিষ্যতে এই চক্র আবারও একই পথে পা বাড়াবে। রোহিঙ্গাদের রঙিন ভবিষ্যতের প্রলোভনে ফেলে তাদের বিদেশে পাচারের চেষ্টা চালাবে। আমরা জানি, কিছুদিন আগেও কক্সবাজার দিয়ে বাংলাদেশি বহু যুবককে পাচারকারীরা জলপথে বিদেশে পাঠানোর চেষ্টা করে। এতে নৌকা ও ট্রলার ডুবিতে বহু তরুণ মারা যায়। তারপরেও অবস্থার উন্নতিতে প্রশাসন কোন কার্যকর ভূমিকা গ্রহণ করেনি। যা সংকট সৃষ্টিতে নতুন রসদ জুগিয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর  উদাসীনতা রাষ্ট্রের ভাবমূর্তিতে চরম আঘাত হেনেছে। এ নিয়ে যখন সারা দেশে সমালোচনার ঝড় ওঠে তখন স্থানীয় প্রশাসন দায়সারা কিছু পদক্ষেপ নেয়। 

সরকার জলপথে মানবপাচারের চেষ্টা প্রতিহত করার জন্য স্থানীয় প্রশাসনকে সজাগ থাকার নির্দেশ দিলেও তারা সে দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে না। তাদের এই দায়িত্বহীনতার খেসারত দিতে হয় সরকারকে। এ অবস্থা আর চলতে দেওয়া সমিচীন নয়। আমরা এই অবস্থার জন্য যারা দায়ী তাদেরকে শনাক্ত করার দাবি জানাই। যাতে আগামীতে এই ধরনের ন্যাক্কারজনক ঘটনা আর না ঘটে। অন্যদিকে সরকারের যখন টনক নড়ে তার আগে বহু মায়ের কোল খালি হয়ে যায়। রোহিঙ্গাপাচারের ঘটনায় দৃশ্যমান হচ্ছে যে, আদম পাচারকারী দালাল চক্র ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তাদেরকে কঠোর শাস্তি না দিলে এটা বন্ধ হবে না।

পরিশেষে আমরা বলতে চাই, উদ্বাস্তু রোহিঙ্গাদের উচিত হবে দালাল চক্রের  প্রলোভনে না পড়া। এ ব্যাপারে স্থানীয় প্রশাসনেরও উচিত হবে তাদের সচেতন করে তোলা। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী মানবতার জননী তাদেরকে আশ্রয় খাদ্য ও চিকিৎসা দিয়ে সারা বিশে^ অনন্য নজির স্থাপন করেছেন। সেই ভাবমূর্তিতে কারো অবহেলায় কালিমালিপ্ত হোক তা কোনভাবেই ঘটতে দেওয়া যাবে না। সময় থাকতে সকলকে বিষয়টি ভেবে দেখবেন বলে আমরা প্রত্যাশা করি। 

Ads
Ads