বিকল্প শ্রমবাজারে গুরুত্ব দিতে হবে

  • ১৫-ফেব্রুয়ারী-২০২০ ০৪:৩৩ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

বিদেশে বাংলাদেশি শ্রমিকরা ভালো নেই। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বাংলাদেশি শ্রমিকদের দিনকাল খুবই খারাপ যাচ্ছে। এই খারাপ যাওয়ার পেছনে বিশেষ কারণটি হলো- মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর অর্থনৈতিক অবস্থা ভঙ্গুর অবস্থায় পড়েছে। দিনদিন সেখানে কাজের সুযোগ কমে আসছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশি শ্রমিকরা সেখানে প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যদিয়ে দিন কাটাচ্ছে। প্রতিদিনই প্রায় অনেক শ্রমিক মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে ফেরত আসছে। এরমধ্যে আরো ভয়ানক খবর হলো অনেক শ্রমিক লাশ হয়ে দেশে ফিরছেন। এটি সরকারকেও ভাবিয়ে তুলেছে বলে মনে হচ্ছে। গত বুধবার গভীর রাতে সৌদি আরব থেকে ১৮৩ জন শ্রমিক দেশে ফিরেছেন প্রায় শূন্য হাতে। সেই সঙ্গে ৮ শ্রমিকের লাশও সৌদি থেকে দেশে ফিরেছে বুধবার। ৮ শ্রমিকের মধ্যে দুজন নারী শ্রমিকও রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর শ্রমবাজার সংকোচিত অবস্থায় পড়া এবং কাজের পরিবেশ নাজুক হওয়ায় বাংলাদেশ সরকারকে মধ্যপ্রাচ্যের বিকল্প দেশে শ্রম বাজার খুঁজে বের করতে হবে এবং সেসব দেশে শ্রমিকদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণসহ তাদের শ্রমের ন্যায্যমূল্যও নিশ্চিত করা জরুরি। 

দেশে এখনো বেকারের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। বেকারজীবনের অবসানকল্পে অনেকে ভিটামাটি বিক্রি করে হলেও বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করেন। বিদেশে যেতে গিয়ে অনেকে আবার রিক্রুট এজেন্সির খপ্পরে পড়ে সর্বশান্ত হন। বিদেশে যাওয়ার জন্য টাকা দিয়েও বিদেশ যেতে পারেন না। এ ব্যাপারে বিদেশে ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে যেসব দালাল গ্রামে-গঞ্জে তৎপর রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। এ বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে অবশ্য কম লেখালেখি হয়নি। তারপরেও দালাল চক্রের তৎপরতা কমেনি এবং যেসব রিক্রুট এজেন্সি প্রচুর টাকা নিয়ে সঠিক নিয়ম-কানুনের মধ্যে বিদেশে শ্রমিক না পাঠিয়ে প্রতারণার আশ্রয় নেয়, তাদের ব্যাপারেও গণমাধ্যম কম সরব হয়নি। এ ক্ষেত্রে ফলাফল শূন্য। ভুয়া রিক্রুট এজেন্সির খপ্পর থেকে এখনো রক্ষা পাচ্ছে না অসহায় সরল বেকার মানুষ। আমরা সরকারকে অনুরোধ করবো এ বিষয়টি গভীরভাবে ভেবে দেখার। ইরাক-আমেরিকা যুদ্ধের পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় অর্থনৈতিক মন্দা জোরেশোরে শুরু হয়। তার অবসান এখনো ঘটেনি। বরং দিনদিন মধ্যপ্রাচ্যের বেশির ভাগ দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা তলানির দিকে ধাবমান। মধ্যপ্রাচ্যে ধনী দেশের মধ্যে সৌদি আরব শীর্ষে। সেই সৌদির অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কতটা খারাপ তার প্রমাণ মেলে বাংলাদেশি শ্রমিকদের দেশের ফিরে আসার ঘটনা। এবং যারা লাশ হয়ে স্বজনদের কোলে ফিরে আসছে তাদের এই ফিরে আসার ঘটনা আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে- সৌদির সাম্প্রতিক বেহলা দশার কথা।

সৌদিতে কয়েক লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক রয়েছে। আমাদের রেমিট্যান্সের বড় একটি অংশ আসে সৌদি থেকে। কিন্তু সেখানে বাংলাদেশি শ্রমিকদের কাজের পরিবেশ ক্রমশ অস্বস্তিদায়ক হয়ে পড়ায় ঘটনা ভিন্নদিকে মোড় নিচ্ছে। বাংলাদেশিরা কাজের উৎসাহ হারিয়ে ফেলছে। সেখানে বাংলাদেশি দূতাবাসের কর্মকর্তারা কী করেন আমরা সঠিক জানি না। দেশের শ্রমিকরা অসহায় অবস্থায় রয়েছে, এটি দূতাবাসের কর্মকর্তাদের দেখার দায়িত্ব রয়েছে।  সৌদি বাংলাদেশি শ্রমিকদের সুবিধা-অসুবিধায় দূতাবাসের কর্মকর্তা পাশে দাঁড়ানো কর্তব্য। সেটি তারা সঠিকভাবে পালন করেন কি-না সরকারের খোঁজ-খবর রাখা দরকার।

সৌদিতে বাংলাদেশি প্রচুর নারী শ্রমিক কাজের জন্য গিয়েছিল। কিন্তু সেখানে গিয়ে যে বিভৎস পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন তারা, তা নিয়ে গণমাধ্যমে প্রচুর লেখালেখি হয়েছে। অনেক নারী যৌননির্যাতনের শিকার হয়ে অসুস্থ হয়ে দেশে ফিরেছেন। এ পরিস্থিতি খুবই বেদনাদায়ক। নারীরা এখন আর কাজ নিয়ে সৌদিতে যেতে চান না। গৃহকর্মের কাজ দেওয়া হবে বলে নারীদের নেওয়া হয়, কিন্তু সৌদির মাটিতে তাদের নেওয়ার পরেই নির্জন প্রকষ্টে রেখে অমানবিক নির্যাতন করা হয়। ঠিক মতো খেতে দেওয়া হয় না। শারীরিক নির্যাতন চালানো হয় তাদের ওপর। এ ব্যাপারগুলো যে সামান্য ঘটনা নয়- তা দায়িত্বশীলদের বুঝতে হবে। অনেক অসহায় নারী শ্রমিক সংসারে স্বচ্ছলতা ফেরানোর আশায় সৌদিতে গিয়েছিল। অনেক টাকা পয়সা খরচ করেই তারা যায়। কিন্তু সেখানে গিয়ে যে অকল্পনীয় পরিস্থিতির শিকার তারা হন, এর জন্য কারা দায়ি তা কি সরকারের দায়িত্বশীলরা জানেন না, এটা আমাদের প্রশ্ন। নিশ্চয় জানেন। অসৎ কিছু রিক্রুট এজেন্সি এ জন্য দায়ী। সরকার অবশ্য অসৎ বেশ কিছু রিক্রুট এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল করেছে। কিন্তু আমাদের মনে হয়- এ ব্যাপারে সরকারের দায়িত্ববানদের আরো সক্রিয় হতে হবে।

পরিশেষে আমরা বলতে চাই, সৌদি আরবসহ গোটা মধ্যপ্রাচ্য এবং বিশে^র বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের ঘামের টাকায় দেশের অগ্রগতি অব্যাহত রয়েছে। ফলে তারা বিদেশে কেমন আছে, তার খোঁজ-খবর নেওয়া সরকারের বিশেষ দায়িত্ব। এ ব্যাপারে সরকার কোনো খোঁজ-খবর রাখে না তাও আমরা বলতে চাই না। তারপরেও বলতে হচ্ছে ক্ষেত্রে ঘাটতি একটা রয়েছে। এই ঘাটতির অবসান হওয়া দরকার। একটি শ্রমিক বিদেশে কর্মরত অবস্থায় কোনো সমস্যা বা প্রতিকূল অবস্থায় পড়লে তার দ্রুত সমাধানে সরকারকে এগিয়ে যেতে হবে। এবং আবারও আমরা বলতে চাই, মধ্যপ্রাচ্যের বিকল্প শক্ত শ্রমবাজার আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। বাংলাদেশে যে দক্ষজনশক্তি রয়েছে, এই জনশক্তি সেখানে সহজেই নিজেদের মানিয়ে নিতে পারবে।

Ads
Ads