চীনা রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য ইতিবাচকভাবে দেখতে হবে

  • ১৮-ফেব্রুয়ারী-২০২০ ০৪:৪৫ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

করোনাভাইরাসের প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশে। সেটা বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে। চীন, বাংলাদেশের বেশ কটি বড় প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত। বহু চীনা প্রকৌশলী এসব প্রকল্পে কাজ করছেন। ইতোমধ্যে গণমাধ্যমে খবর এসেছে, পদ্মাসেতুর কাজে ধীরগতি আসতে পারে। কারণ এই সেতুতে বহুসংখ্যক চীনা প্রকৌশলী কাজ করছে। নিজ দেশে বেড়াতে গিয়ে অনেক চীনা প্রকৌশলী আর বাংলাদেশে ফিরতে পারছেন না। এ ছাড়া পদ্মাসেতু নির্মাণে অনেক উপাদান চীন থেকে আনতে হয়। সেগুলো আনার ব্যাপারে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে করোনাভাইরাস। পদ্মাসেতুসহ সরকারি নানা প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়েও চীনের সঙ্গে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের স্বার্থগত সম্পর্ক রয়েছে। বেসরকারি পর্যায়ে ব্যবসায়ীক সম্পর্ক বিদ্যমান- যার ওপরে গভীর প্রভাব ফেলেছে করোনা। তবে এ ব্যাপারে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদেও ধৈর্য ধরার অনুরোধ করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত লি জিমিং। গত সোমবার জাতীয় প্রেসক্লাবে কূটনৈতিক প্রতিবেদকদের সংগঠন আয়োজিত ‘ডিক্যাব টকে’ অংশ নিয়ে চীনা রাষ্ট্রদূত এ অনুরোধ জানান। এ বিষয়টি ছাড়াও তিনি রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গ নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন। সামগ্রিক বিচারে চীনা রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যে যথেষ্ট ভাবনার উপাদান রয়েছে। 

বাংলাদেশের উন্নয়নে চীনের অংশগ্রহণ যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছে তাদের অবদান। এই অবস্থানকে অস্বীকার বা অগ্রাহ্য করা যাবে না। জাতির স্বপ্ন পদ্মাসেতুতে চীনাদের ভূমিকা আবার চলমান অনেক মেগা প্রকল্পের অংশীদার  চীন। এসব প্রকল্প গভীরভাবে জনসংশ্লিষ্ট। বৃহত্তর ও জনস্বার্থে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে চীনের ব্যবসায়ীদের যে নিবিড় ব্যবসায়ী মেলবন্ধন গড়ে উঠেছে তাও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কূটনৈতিক দিক দিয়ে বাংলাদেশ-চীনের মধ্যে বিরাজ করছে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। এই সম্পর্কের বিবেচনাতেই চীন, বাংলাদেশের উন্নয়নের অংশীদার হয়ে কাজ করে যাচ্ছে। তাদের এই অবদান আমাদের উন্নয়নের চাকাকে বেগবান করেছে। পারস্পরিক সমভিত্তিক বন্ধুত্ব এখানে জিয়নকাঠি হিসাবে দুটি দেশকে একত্রিত করেছে। তাই আমরা গভীরভাবেই চীনা সরকারের উপর কৃতজ্ঞ। 

‘ডিক্যাব টকে’ চীনা রাষ্ট্রদূত  দৃঢ়ভাবে বলেন, ‘করোনাভাইরাসের কারণে চীনকে বাদ দিয়ে অন্য দেশ থেকে পণ্য আমদানির কথা ভাবার মতো পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি। বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের প্রতি আমার জোরালো পরামর্শ হচ্ছে, চীনকে সাপ্লাই চেইন থেকে বাদ দিয়ে অন্য কোনো দেশের দিকে যাওয়া তাদের উচিত হবে না। তিনি এ বিষয়ে তার বেশ ক’দফা যুক্তি তুলে ধরেছেন। তার প্রথম যুক্তি এটা প্রায় অসম্ভব। দ্বিতীয়ত, খরচ এবং তৃতীয়ত, বর্তমান সময়ে তা অপ্রয়োজনীয়। রাষ্ট্রদূূতের কথা এবং তার বক্তব্য তুলে ধরতে চাই। তিনি বলেছেন, তারা (বাংলাদেশ) যেন ব্যবসায় গন্তব্য পরিবর্তন না করেন।’ লি জিমিং এর অনুরোধ আমাদের ব্যবসায়ী সমাজ ভেবে দেখতে পারেন। ‘করোনার’ কারণে সাময়িক যে সংকটের উদ্ভব হয়েছে, তা, হয়তো অচিরেই কেটে যাবে। করোনাজনিত সমস্যা কেটে গেলে চীন থেকে যাবতীয় পণ্য আনা তখন আর কঠিন হবে না। ফলে চীনা দূতের বক্তব্য বিবেচনার দাবি রাখে। চীনা দূতের অনুরোধ উপেক্ষা করে চীনকে সাপ্লাই চেইন থেকে বাদ দিয়ে অন্য কোনো দেশের দিকে গেলে পরবর্তীতে চীন সরকার কষ্ট পেতে পারে। এই কষ্ট তাদের মনে দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। সুতরাং আমরা আমাদের ব্যবসায়ী সমাজকে চীনা দূতের অনুরোধকে হালকাভাবে না নিয়ে গভীরভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করে অতঃপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছার আহ্বান জানাই। 

‘ডিক্যাব টকে’ চীনা দূত রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে কথা বলেছেন। চীনা দূতের বক্তব্যের রেশ টেনেই আমরা বলতে চাই যে, প্রায় বারো লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। এই বিশাল সংখ্যক রোহিঙ্গা আমাদের দেশটির জন্য মস্ত বড় বোঝা। তা সহজেই অনুমান করা যায়। মিয়ানমার সরকার নিরীহ রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা-নির্যাতন-ধর্ষণ-বাড়িঘর পোড়ানো সহ নির্বিচারে সব অপরাধ করে যাচ্ছে। রোহিঙ্গাদের ওপর এ জাতীয় ঘটনা ঘটিয়ে তাদেরকে বাংলাদেশে ঠেলে দিয়েছে মিয়ানমার। এটা সম্পূর্ণ মানবতাবিরোধী কাজ। এই মানবতাবিরোধী কাজের বিচারে চীনকে সাহায্যের হাত আরও প্রসারিত করতে হবে। বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের মর্যাদা দিতে এবং দু’দেশের মধ্যে যে বিশাল বাণিজ্যিক সম্পর্ক বিদ্যমান রয়েছে, তার স্বার্থে চীনের কর্তব্য রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য  মিয়ানমারে উপর  কঠোর চাপ প্রয়োগ করা। এটা চীন সরকার করবে বলে আমরা বিশ^াস করি। সংবাদ সম্মেলনে চীনা রাষ্ট্রদূত একটি গভীর সত্যকে তুলে ধরেছেন। এ জন্য তাকে আমরা অভিনন্দিত করছি। তিনি বলেছেন  রোহিঙ্গা নামক সংকটের মূলহোতা মিয়ানমার । এই স্বীকারোক্তি মানেই সত্যকে স্বীকার করে নেওয়া। উদ্ভুত রোহিঙ্গা সমস্যা  মিয়ানমারকেই এর সমাধান করতে হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। চীনা দূত আরও বলেন, ‘এ সংকট সমাধানে বাংলাদেশ-মিয়ানমার যৌথ গ্রুপ কাজ করছে। দুই দেশের মধ্যে আলোচনা করে এ সংকট সমাধানের জন্য চীন বাংলাদেশ ও মিয়ানমার উভয় দেশকেই সহযোগিতা দিচ্ছে।’ আমরা মনে করি এই সহযোগিতার মাত্রা তীব্র হবে। বিশেষ করে মিয়ানমার সরকারকে অধিক চাপ দিতে হবে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে। সবাই জানে, মিয়ানমার চীন সরকারের কোনো চাপ অগ্রাহ্য করতে পারবে না। চীন-মিয়ানমার দীর্ঘকাল জুড়ে বন্ধুত্বের বন্ধনে আবদ্ধ। 

সেজন্যই পরিশেষে আমরা বলতে চাই একই সাথে বিশ্বাস করি, রোহিঙ্গা সংকট দ্রুত সমাধানে চীন গতিশীল ভূমিকা রাখবে। অন্যদিকে আমাদের ব্যবসায়ী সমাজের কাছে চীনা দূত যে অনুরোধ রেখেছেন, তাও আমাদের ব্যবসায়ীরা বিবেচনা করে দেখবেন বলে আমরা প্রত্যাশা করি। আন্তর্জাতিক ব্যাণিজ্যের ক্ষেত্রে যা সুদূর প্রসারী ভূমিকা রাখবে। 

Ads
Ads