আজও ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে চুড়িহাট্টা

  • ১৯-ফেব্রুয়ারী-২০২০ ০৪:৪৯ পূর্বাহ্ণ
Ads

:: ভোরের পাতা ডেস্ক ::

২০১৯ সালের আজকের দিনটিও ছিল বুধবার। রাত বাজে তখন সাড়ে ১০টা। চকবাজার নন্দকুমার সড়কের চুড়িহাট্টা পাঁচমুখী মোড়ে তখনও তীব্র যানজট। ঘিঞ্জি রাস্তায় আটকে ছিল পিকআপ, প্রাইভেটকার, রিকশা, ঠেলাগাড়ি আর মোটরসাইকেলসহ শতাধিক যানবাহন। হঠাৎই বিকট শব্দের বিস্ফোরণ।

গাড়ির সিলিন্ডার প্রথমে বিস্ফোরণ হয়। তারপর বাম পাশে থাকা এসির ট্রান্সফরমারে সে বিস্ফোরণের লেলিহান শিখা আঘাত হানে। সেখান থেকে আগুন লেগে যায় বিদ্যুতের ট্রান্সমিটারে। ওই আগুন ছড়িয়ে পড়ে গাড়িতে। পাশের একটি পিকআপে অনেকগুলো গ্যাস সিলিন্ডার নেয়া হচ্ছিল। সব সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হয়ে পাশের হোটেলে লেগে যায় আগুন। ওই হোটেলে চারটা বড় বড় রান্নার সিলিন্ডার ছিল। ওই সিলিন্ডারগুলোও বিস্ফোরণ হয়ে আগুন ছড়িয়ে পড়ে।

এরপর রাস্তায় থাকা গাড়িগুলোর সিলিন্ডার বিস্ফোরণ শুরু হয় একে একে। এক গাড়ি থেকে তা ছড়িয়ে পড়ে অন্য গাড়িতে। আগুনের লেলিহান শিখায় যানজটে আটকে থাকা মানুষগুলো কিছু বুঝে ওঠার আগেই প্রাণ হারায়। নিমিষেই চুড়িহাট্টা মোড় হয়ে ওঠে মৃত্যুকূপ। সেই ট্র্যাজেডির এক বছর হতে চলল।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ভবনের চেয়ে রাস্তায় থাকা মানুষই প্রাণ হারায় বেশি। প্রথমত গাড়ির গ্যাস সিলিন্ডার, দ্বিতীয়ত ভবনে থাকা রাসায়নিক দ্রব্য আর সবশেষ পুরান ঢাকার অপরিকল্পিত সরু গলিপথই আগুনকে দেয় দানবের রূপ।

ঠাসাঠাসি করে থাকা প্লাস্টিক পণ্যের কাঁচামাল, প্রসাধনীর গুদাম, হোটেলের গ্যাস সিলিন্ডার, বই-খাতা বাধাইয়ের দোকান আর সংকীর্ণ রাস্তায় তীব্র যানজট- এসবই চকবাজারের চুড়িহাট্টা মোড়ের আগুনকে ভয়াবহ মাত্রা দিয়েছিল।

স্থানীয়দের ভাষ্য, আগুনের তীব্রতা এতটাই ছিল যে, জ্যামের মধ্যে রিকশায় বসে থাকা এক দম্পতি শিশু-সন্তানসহ জীবন্ত দগ্ধ হয়ে মারা যান। আর প্রথম যে ভবনে আগুন লাগে, সেই ওয়াহেদ ম্যানশনের দোকানপাট ও গুদামে থাকা ক্রেতা-বিক্রেতাদের অধিকাংশই বের হওয়ারই সুযোগ পাননি। কিছু দেহ এমনভাবে পুড়ে যে, শনাক্ত করারও উপায় নেই।

চুড়িহাট্টা মসজিদের পাশে প্রয়াত ওয়াহেদ চেয়ারম্যানের চারতলা ভবনটিতে (ওয়াহেদ ম্যানশন) প্রথমে আগুন লাগে। তারপর তা পাশের রাজমহল নামে একটি রেস্তোরাঁ এবং সরু রাস্তার উল্টো দিকের তিনটি ভবনে ছড়ায়। পুরান ঢাকার ওই সংকীর্ণ সড়কে রাত সাড়ে ১০টায় অগ্নিকাণ্ড শুরুর সময়ও ছিল যানবাহন আর মানুষের ভিড়। তাছাড়া মসজিদের সামনে ফুটপাতের উপর দোকান, আনাস হোটেলের সামনে একটি ফলের দোকান এবং আরো কয়েকটি ভাসমান দোকান ছিল। মসজিদের উত্তর পাশে, সামনে ও দক্ষিণের রাস্তায় ছিল গাড়ি আর চলতি পথের যাত্রীদের ভিড়।

আগুন লাগার দুই মিনিট আগে ওই এলাকার পরিস্থিতি কেমন ছিল তা উঠে এসেছে স্থানীয় আজগর আলী লেনের বাসিন্দা আবদুল আলিমের ভাষ্যে। তিনি জানান, আমি রাজমহল হোটেল থেকে রুটি নিয়ে বাসায় যাই। যখন আমি হোটেলে আসি তখন চুড়িহাট্টা মোড়ে ব্যাপক যানজট দেখতে পাই। গাড়িগুলো সেখান থেকে সহজে বের হতে পারছিল না, যানজটের কারণে পথচারীদের হাঁটতেও সমস্যা হচ্ছিল।

চকবাজারের প্লাস্টিক কাঁচামালের ব্যবসায়ী সাব্বির হোসেন বলেন, ওয়াহেদ ম্যানশনের দোতলার পুরোটা পাইকারি ও খুচরা প্লাস্টিক জিনিসপত্রের কাঁচামালের দোকান ও গোডাউন ছিল। বিভিন্ন প্রসাধনীর গোডাউনও ছিল সেখানে। ওয়াহেদ ম্যানশনের সামনেরও দুইটি ভবনের নিচ ও দোতলাতে একাধিক এ ধরনের দোকান ছিল। এলাকাটা মূলত প্লাস্টিক কাঁচামালের দোকান ও গোডাউন।

আগুনের ভয়াবহতার বর্ণনা করে সাব্বির বলেন, শুনেছি গাড়ির সিলিন্ডার থেকে আগুন লাগে, তারপর যানজটে আটকে থাকা অন্যান্য গাড়ির সিলিন্ডার, খাবার হোটেলের সিলিন্ডার ও অন্যান্য যানবাহনের জ্বালানির কারণে পুরো রাস্তায় আগুন ছড়িয়ে পড়ে। এরপর ওয়াহেদ ম্যানশনের দোতলায় প্লাস্টিকের দানা ও অন্যান্য প্রসাধনী আগুনকে আরো দাউ দাউ করে তুলে।

আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার পর ঘটনাস্থল থেকে ৬৭ জনের পোড়া লাশ মর্গে পাঠান উদ্ধারকর্মীরা৷ হাসপাতালে ভর্তি হয় আরো ১৫ জন। এদের মধ্যে ৪ জন পর্যায়ক্রমে কয়েকদিনের ব্যবধানে মারা যান। পরে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ৭১ জনে৷ ঘটনার পর মামলা হয়৷ ঘটনা তদন্তে কমিটি গঠন করা হয়।

বর্তমানে হাজী ওয়াহেদ মঞ্জিলের নীচে বসেছে কিছু অস্থায়ী দোকান৷ ভবন মালিক নীচের কয়েকটি দোকান সারিয়ে নতুনভাবে ব্যবসা শুরু করতে চেয়েছিলেন৷ তবে ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় সরকারি বিভিন্ন সংস্থার বাধায় তা আর হয়নি৷ ওপরের তলাগুলো এখনও সাক্ষ্য দিচ্ছে ওই রাতের ভয়াবহতার। দেয়ালের ইট পুড়ে কালো হয়ে রয়েছে এখনও। তবে ভবনটির নিচতলার গুদামের মূল ফটক তালাবদ্ধ।

ওই ভবনের মালিককে পাওয়া না গেলেও স্থানীয়রা বলেন, ভবনটিতে এখন আর কেউ থাকে না; কিছু রাখাও হয় না। ভবন মালিকদের ঘটনার পর আর দেখা যায়নি। আগুন নেভানোর পর ওয়াহেদ ম্যানশন ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হলেও নিচতলার মার্কেটের দোকানগুলোতে গত কয়েক মাস আগে সংস্কার করা হয়েছে। পোড়া ইট সরিয়ে নতুন ইটের গাঁথুনি দেয়া হয়েছে।

আগুনে ওয়াহেদ ম্যানশনসহ ৭টি ভবন পুড়লেও চারটি পুরো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। ওয়াহেদ ম্যানশনের পশ্চিম পাশে দোতলা ভবন ও চুড়িহাট্টা মসজিদের পূর্ব পাশের চারতলা একটি বাড়ি এবং পূর্ব পাশের একটি বাড়ি ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয় ওই সময়ে। সম্প্রতি ওই এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, ওয়াহেদ ম্যানশন ও এর সামনের ভবনটি ছাড়া সব ভবনই সংস্কার করা হয়েছে। এখন বোঝা যাচ্ছে না, আগুন এসব ভবনে এত মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল!

বারবার ভয়াবহ দুর্ঘটনার পরও তেমন বদলায়নি পুরান ঢাকার দৃশ্যপট। ঘনবসতিপূর্ণ আর ঘিঞ্জি এলাকার অনেক বাসাবাড়ির নিচে এখনও ঝুঁকিপূর্ণভাবে তৈরি হচ্ছে নানা ধরনের কেমিক্যাল সামগ্রী। অনেক বাসার নিচে গুদামও রয়েছে। অনেকেই বলছেন, দ্রুত দৃশ্যপট না বদলালে হয়তো বারবার এমন কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে।

এর আগে ২০১০ সালের ৩ জুন পুরান ঢাকার নিমতলীতে কেমিক্যালের গুদামে ভয়াবহ আগুনের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় ১২৪ জনের মৃত্যু হয়।

Ads
Ads