ভালোবাসা থেকেই কেবল ভাষার সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব 

  • ২০-ফেব্রুয়ারী-২০২০ ০৪:০১ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

ঢাকার রাজপথ বুকের তাজা রক্তে লাল হয়ে গেল। বিদ্যুতের মতো এ সংবাদ পৌঁছে গেল সারা বাংলায়। চট্টগ্রামের প্রতিবাদী কবি মাহবুব-উল-আলম চৌধুরী লিখে ফেললেন সেই অমর কবিতা। ‘কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি।’ এরপর কত কবিতা আর দ্রোহী মানুষের প্রতিবাদে ঢাকার রাজপথ উত্তাল। যারা আমার মায়ের ভাষা কেড়ে নিতে চায় তাদের গুলির মুখে বুক পেতে দিলো সাহসী বাঙালি। একদিনেই উধাও হয়ে গেল ভিরু বাঙালির তকমাটা। প্রতিবাদের ভাষা খুলে দিল নতুন দিগন্ত। ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়’ ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’-এমনি গান আর সেøাগান মুখে বাঙালি রাস্তায় নামে। মৃত্যুভয় ওদের ভীত করেনি।

বরং মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে ওরা হয়ে মৃত্যঞ্জয়ী। তাইতো গুলি করে প্রতিবাদকে রুখতে পারেনি সেদিনের স্বৈরশাসক। নুরুল আমিনের পুলিশ মিলিটারি হার মানে। স্বীকৃতি পেল বাংলা ভাষা। অবহেলা আর অনাদরের শৃঙ্খল ভেঙে বাংলা স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত হলো। এটি কোনো গল্প নয়। একটি জাতির নবজাগরণের ইতিহাস।
আবার আমাদের মাঝে ফিরে এসেছে সেই মহান দিন। আজ  সেই ২১ ফেব্রুয়ারি মহান শহীদ দিবস। বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কল্যাণে যা এখন দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক উপাধি পেয়েছে। তাই দিনটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। তারপরেও প্রশ্ন থেকে যায় আমরা কি সত্যিই সেদিনের আদর্শ এবং শহীদদের ত্যাগকে সম্মান দিতে পেরেছি?

অনেক আগ থেকেই বাংলাভাষা এবং বাংলাদেশ বৈষম্যর শিকার। ব্রিটিশ শাসনামলে বাংলাকে দমিয়ে রাখার অনেক কূট কৌশল আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। সেসময় প্রবাদ ছিল ‘whats bangol think today next india thinks tomorrow.’ সেই বাংলাকে নিয়ে ষড়যন্ত্র শুরু হয়। বলা হলো বাঙালি ভিরু। কিন্তু বিশ্বে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে বাঙালি। তারা মাতৃভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছে যা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল। তবে বাঙালি শান্তিপ্রিয় জাতি এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তাদের এই শান্তিকে দেখা হতো দুর্বলতা হিসাবে। এজন্যই হয়ত এই পদবি ভিরু বাঙালি! এই ভাষা আন্দোলনের দেখানো পথ বেয়ে ১৯৭১ সালে এসেছে মহান স্বাধীনতা। 

আমাদের ভাষা আন্দোলনের সূচনা হয় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মি. জিন্নাহ ঢাবির  কার্জন হলে  ঘোষণার পর। তিনি যখন বলেন, ‘উর্দু এন্ড উর্দু উইল বি স্টেট ল্যংগুয়েজ অব পাকিস্তান’- তখন পুরো হল প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান তখন জেলে। তিনি সেই আন্দোলনে জেল থেকে নির্দেশনা দেন। একসময় বাঙালির প্রতিবাদ স্বতঃস্ফূর্ততা পায়। কেবল ছাত্ররা নয়  কাতারে কাতারে বাংলা ভাষাভাষী বিভিন্ন পেশা এবং শ্রেণির মানুষ রুখে দাঁড়ায় পাকিস্তান সরকারের ভাষা ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে। বাঙালির এই জাগরণে প্রমাদ গোনে নুরুল আমিন এবং তার প্রভুরা। আন্দোলন প্রতিহত করতে জারি করা হয় ১৪৪ ধারা। কিন্তু প্রতিবাদী বাঙালিরা তাদের এই আইন মানবে কেন? তড়িৎ সিদ্ধান্ত হয় ১৪৪ ধারা ভঙ্গের। সেদিন অনেক নেতাই এই ১৪৪ ধারা ভঙ্গের বিরোধিতা করে শান্তিপূর্ণ অবস্থানের পরিকল্পনা করে। কিন্তু প্রতিবাদীরা এই সিদ্ধান্ত মানতে নারাজ। তারা সিদ্ধান্ত নেয় ১৪৪ ধারা ভেঙে মিছিল করার। সিদ্ধান্ত হয় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মিছিল নিয়ে তারা এগিয়ে যাবে।

কোনোভাবেই মায়ের ভাষার মর্যাদা ক্ষুণœ হতে দেবে না। প্রতিবাদী মিছিল বের হলে বিনা উস্কানিতে পুলিশ গুলি চালায়। এতে রাজপথে ঝরে পড়ে বেশ কয়েকটি তাজা প্রাণ। এদিন শহীদ হন অনেকেই। কিন্তু লাশ পাওয়া যায়নি। কারণ, সব লাশই পুলিশ নিয়ে যায়। কেবল বরকত, সালাম, শফিক, রফিক জব্বারের লাশ পাওয়া যায়। এরপর তাদের লাশ নিয়ে শুরু হয় মিছিল। যোগ দেয় হাজারো  প্রতিবাদী জনতা। আবারও মিছিলে গুলি। ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় মিছিল। তবে তা সাময়িক। পাকিস্তান গণপরিষদ সদস্য ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত গুলির প্রতিবাদে ওয়াক আউট করেন।  তখন আরেকটি কবিতা প্রতিবাদী মানুষকে সাহস জোগায়। আব্দুল গাফফার চৌধুরীর লেখা ...‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কী ভুলিতে পারি’..। প্রথম এই গানটিতে সুরারোপ করেন গণসংগীত শিল্পী আব্দুল লতিফ। পরে তাতে সুরারোপ করে গানটিকে অমরত্ব দেন শহীদ আলতাফ মাহমুদ। আজ ছয়যুগ পেরিয়ে এসেও আমরা সেই ভাষার সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হচ্ছি। এখন বাংলা ভাষা বড় করুণ অবস্থায় পৌঁছেছে। দেশের এফএম বেতারগুলো বাংলার ব্যবচ্ছেদে নেমেছে। তারা বিকৃত উচ্চারণে বাংলার মহাত্ম্য যেমন ক্ষুণ্ণ করছে পাশাপাশি বিদেশি ভাষার অপপ্রয়োগ করে বাংলাকে হাস্যষ্পদ করে তুলছে। তাদের মুখে নিঃসৃত বাংলা শুনলে মনে হয় এরা ইচ্ছে করেই বাংলাভাষাকে অপমান করার মিশনে নেমেছে। কোনো বিদেশি ভাষার বিরুদ্ধে আমাদের কোনো ক্ষোভ বা অভিযোগ নেই।

আমরা আমাদের ভাষাকে সমুন্নত রাখতে চাই তার আপন মহিমায়। সেখানে বিকৃতি কোনোভাবেই কাম্য নয়। ভাষার এই অপব্যবহার রোধ আইন দিয়ে সম্ভব নয়। ভাষার প্রতি ভালোবাসা থেকেই কেবল ভাষার সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব। আর তার জন্য প্রয়োজন  নিজের ভেতর থেকে তাগিদ অনুভবের। আজকের এই দিনে আমাদের শপথ নিতে হবে। বিকৃত বাংলাকে রুখতে দ্বিতীয় সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। ’৫২র দাবি সর্বস্তরে বাংলার প্রচলন তা নিশ্চিত করতে হবে। মহান শহীদ দিবস এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে এই হোক আমাদের শপথ।    

Ads
Ads