বিকৃত বাংলা বলার অবসান হোক 

  • ২২-ফেব্রুয়ারী-২০২০ ০৪:৪০ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

একমাত্র বাঙালিকেই করতে হয়েছে মাতৃভাষার জন্য রক্তদান। আর এই রক্তদানের মাধ্যমেই আমরা মাতৃভাষায় কথা বলার সুযোগ পেয়েছি। আমাদের উপর উর্দু ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র নসাৎ করতে সেদিন জীবনবাজি রেখেছেন আমাদের পূর্বপুরুষরা। উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা এই ঘোষণাকে রক্ত দিয়ে প্রতিহত করে বাঙালি। সেদিন বীর বাঙালির তীব্র প্রতিবাদেই আমরা আমাদের মায়ের ভাষায় কথা বলার সুযোগ পেয়েছি। আমাদের রক্ত নিয়ে রাজপথে হোলি খেলেছে সেদিন উর্দু প্রেমিকরা।  ১৯৫২ ভাষা আন্দোলনে মাতৃভাষা বাংলার জন্য শহীদ হন সালাম, রফিক, শফিক জব্বার বরকত প্রমুখ। তাদের আত্মত্যাগের কারণেই আমাদের মাতৃভাষা বাংলাকে কেড়ে নিতে পারেনি সেদিনের পশ্চিম পাকিস্তান সরকার।  

বাংলা ভাষার জন্য এই আত্মত্যাগ, রক্তদান তার কতটুকু মূল্য আমরা দিতে পেরেছি? তাদের সে আদর্শ আমরা কতটুুকু লালন করতে পেরেছি সেটা ভেবে দেখার সময় এসেছে। সর্বস্তরে বাংলাভাষার যে স্বপ্ন আমাদের শহীদরা দেখেছিলেন তার বাস্তবায়ন আজও হয়নি। অফিস আদালতে বাংলা প্রচলনের সরকারি নীতিমালা থাকলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। যা আমাদেরকে ভীষণভাবে পীড়া দেয়। ভালো বাংলা জানা লোকের চেয়ে কদর বেশি ইংরেজি ভাষা জানা লোকের। এই হীনমন্যতা শহীদদের আত্মাকে চরমভাবে অপমানিত করছে। দৈনন্দিন প্রয়োজনে আমরা আমাদের মাতৃভাষাকে উপহাস করে চলেছি। এ বিষয়ে উদাহরণ অনেক টানা গেলেও আসল বিষয় মাতৃভাষার মর্যদা সেটি কিন্তু অধরাই থেকে যাচ্ছে।  বাংলাকে পাশ কাটিয়ে আমাদের সন্তানদেরকে বিদেশি ভাষায় শিক্ষিত করতে অভিভাবকদের আগ্রহ এক্ষেত্রে দুর্ভাগ্যজনক। বাংলা না পড়িয়ে আমাদের সন্তানদের  ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলে ভর্তি করতে এবং তার জন্য সংগ্রাম করতে পিছপা হই না।  এসব স্কুলে ইংরেজি ভাষার ওপর জোর দেওয়া হয়। যদিও লেখা থাকে বাংলাকে উপেক্ষা করা হয়না। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানকার শিক্ষার্থীদের বাংলায় কথা বলা বারণ। যদি কেউ বাংলা চর্চা করে তবে তাকে বিভিন্নভাবে উপহাস করা হয়। ফলে এখানকার শিক্ষার্থীরা ভালো করে বাংলায় কথা বলতে পারে না। তারা ইংরেজি ঢঙে কথা বলে।যার নতুন নামকরণ হয়েছে বাংরেজি। ইংরেজি মাধ্যমে পড়–য়া শিক্ষার্থীদের ইংরেজি ঢঙে কথা বলার বিষয়টি লক্ষ্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি এতে হতাশ হয়েছেন এবং এর সমালোচনা করেছেন। আমরাও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একমত। একই সাথে এই অবস্থার অবসান চাই।  

আমরা এ বিষয়ে শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। আমরা বলতে চাই, বাংলা ভাষার প্রতি ভালোবাসা মানেই দেশের প্রতি ভালোবাসা।   কিন্তু সেখানেই সংকট। নতুন প্রজন্মের অনীহা আমাদের সকল অর্জনের পিঠে ছুরিকাঘাত করছে। ভাষার জন্য শহীদদের অর্জনকে অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই। ভাষার জন্য বাঙালির আত্মত্যাগ বিশে^ নজিরবিহীন।বাংলাদেশ ছাড়া পৃথিবীর কোথাও এমন ঘটনার নজির পাওয়া যাবে না, যে মুখের ভাষা টিকিয়ে রাখতে অন্য কোনো জাতিকে রক্ত দিতে হয়েছে। তাই নতুন প্রজন্ম ইংরেজি ভাষায় পড়াশোনা করলেও মাতৃভাষার প্রতি তাদের ভালোবাসা অটুট রাখার কোনো বিকল্প নেই।এখানে ভাষা এবং দেশ একাকার।   যখন কথা বলতে হবে সেখানে যেন অন্য কোনো ভাষা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করে। সাবলীল বাংলার চর্চা অব্যাহত রাখতে হবে। ভাষার কৌলিন্য দেখানোর জন্য নিজের ভাষার প্রতি অবহেলা ও অশ্রদ্ধা প্রর্দশন কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। প্রতিটি জাতি তার নিজের ভাষার প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রকাশ করে থাকে। যারা নিজের মাতৃভাষার পরিবর্তে বিদেশি ভাষাকে বেশি মর্যাদা দিতে চায়, তারা  দেশপ্রেম নিয়েও প্রশ্ন তোলা যায়? কবি বলেছেন, ‘বিনে স্বদেশি ভাষা মেটে কি আশা’। একসময় মাইকেল মধুসূদন বাংলাকে অবহেলা করেছিলেন। তারপরে তিনি তার উপলব্ধিতে আনতে সক্ষম হন বাংলা ভাষা ছাড়া তার মর্যাদা কোনোভাবেই প্রতিষ্ঠিত হবে না। তাই তিনি লিখলেন......ভা-ারে তব বিবিধ রতন, তা সবে অবহেলা করি...... 

প্রধানমন্ত্রী সঠিক বলেছেন গত শুক্রবার। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের আলোচনা সভায় ইংরেজি উচ্চারণের বাংলা নিয়ে যে হতাশা তিনি ব্যক্ত করেছেন তার যথার্থতা অস্বীকারের উপায় নেই। ইংরেজি মাধ্যমে পড়–য়া শিক্ষার্থীদের এই যে দৈন্যদশা তা হতাশাই সৃষ্টি করছে। বিশ^নেতা-রাষ্ট্রনায়ক-প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন,‘এখনকার অনেক ছেলেমেয়েকে দেখা যায় ইংরেজি উচ্চারণে বাংলা বলার চেষ্টা করে। বাংলা বলতে তাদের কেমন যেন কষ্ট হয়। অথচ তারা এই দেশের আলো-বাতাসে, এই দেশের মাটিতেই বড় হয়েছে। যারা বাংলাদেশের মাটিতে বড় হয়ে বাংলা বলতে পারে না, ইংরেজি উচ্চারণে কথা বলে, তাদের জন্য করুণা করা ছাড়া কিছুই বলার নেই। বিশ্বায়নের এই যুগে ব্যবসা-বাণিজ্যসহ আন্তর্জাতিক যোগাযোগের জন্য অন্য ভাষা শেখার প্রয়োজন আছে। তবে সেটি মাতৃভাষাকে বাদ দিয়ে নয়।’

শহীদের রক্তের বিনিময়ে আমরা মাতৃভাষা বাংলা পেলেও সহজে বিদেশি ভাষা বিশেষ করে ইংরেজির সংশ্লিষ্টতা থেকে সহজে নিজেদেরকে গুটিয়ে নিতে পারিনি। এদেশে একশ্রেণির মানুষ রয়েছে নিজের মাতৃভাষা থেকে ইংরেজি ভাষাকেই তারা বেশি কৌলিন্য দিতে অভ্যস্ত। ইংরেজি ভাষার কৌলিন্য বেশি বলে মনে করে থাকে। এটা যে তাদের ভুল ধারণা তা তারা স্বীকার করতেও চায় না।  আমরা লক্ষ্য করেছি, একটা সময় ইংরেজির ব্যবহার ছিল সর্বত্র। বর্তমানে সরকারের সময়োপযোগী উদ্যোগের ফলে ক্রমান্বয়ে তা সংকুচিত হয়ে এসেছে। তারপরেও বাংলাকে প্রত্যাশানুযায়ী ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হয়নি।

বাংলা ভাষার প্রতি এদেশের মানুষের কতটা ভালোবাসা তা সবাই ভালো করেই জানে। এই যে ভালোবাসা, তার প্রতি নজর দিয়ে বাংলার ব্যবহারকে আরও সর্বস্তরে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিতে হবে। এদেশে এখনো অনেক মাধ্যমের শিক্ষার্থীদেরকে ইংরেজি ভাষায় পড়তে হয়, বিশেষ করে চিকিৎসা ও প্রকৌশলীর শিক্ষার্থীদের বইপুস্তক বাংলায় পাওয়া যায় না। বাংলা বই কেন দুর্লভ এটা ভাবতেও আমাদের লজ্জা লাগে। আমরা মনে করি এক্ষেত্রে সরকারের বড় ভূমিকা রয়েছে। বাংলা ভাষায় এসব বই পাওয়া নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। তবে অনুবাদের মাধ্যমেও দ্রুত এই সমস্যার সমাধান করা যেতে পারে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু জাতিসংঘে বাংলায় প্রথম ভাষণ দেন। বাংলার প্রতি জাতির জনকের এই যে ভালোবাসা তা অনন্য নজির স্থাপন করে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দিয়েছেন। আমাদের মাতৃভাষা বাংলার বিকাশে তার অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে। একুশে ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি পাওয়ার পর তিনি ঢাকায় প্রতিষ্ঠা করেন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট।  

আমরা বলতে চাই, কেউ চাইলেই নিজের মাতৃভাষা ছাড়াও আরও ভাষা শিখতে-পড়তে পারেন। এতে কোনো হীনমন্যতা নেই। তবে হীনমন্যতা তখনই দেখা দেয়, যখন কেউ নিজের মাতৃভাষার চেয়ে ভিনদেশি ভাষাকে বড়ো করে দেখে। এ মনোভাব কারোর মধ্য থাকা উচিত নয় বলে আমরা মনে করি। আমার মনে করি মাতৃভাষা বাংলা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের গুরুত্ব সবাইকে উপলব্ধিতে আনতে হবে। আর নিজেদের ভিতরকার সকল দুর্বলতা ঝেড়ে ফেলে বাংলাকে মনেপ্রাণে কথায় লালন করতে হবে। ’৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি যে স্বপ্ন বাস্তবায়নে রফিক শফিক জব্বার বরকতরা জীবন উৎসর্গ করেছেন।শহীদদের সেই প্রত্যাশা পূরণে প্রয়োজনে দ্বিতীয় সংগ্রাম শুরু করা যেতে পারে। আসুন, আমরা বাংলাকে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠা করার দুর্বার সংগ্রামে শরিক হই।

Ads
Ads