দ্রুত খুলে দেওয়া হোক মালয়েশিয়া শ্রমবাজার

  • ২৪-ফেব্রুয়ারী-২০২০ ০৪:৩৪ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য খুলে দেওয়া হবে। এ খবরে নতুন করে আশার আলো দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মাধ্যমে প্রচুর রেমিটেন্স আসবে এই সম্ভাবনায় বিষয়টি এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। আমরা কয়েক বছর ধরেই লক্ষ্য করছি, আমাদের শ্রমিকদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুলে দেওয়া নিয়ে অস্পষ্ট অবস্থা বিরাজ করছে। উভয় দেশের সরকারের মধ্যে কথা চালাচালি হলেও বাস্তবে আমাদের শ্রমিকদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুলে দেওয়া হয়নি। বেশ কিছুকাল আগে ২ লাখ শ্রমিক বাংলাদেশ থেকে নেওয়া হবে বলে শোনা  গেলে তারও বাস্তবায়ন হয়নি। সে সময় বাংলাদেশ এবং মালয়েশিয়ার সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে বলে জানানো হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দেখা যায়, নানা জটিলতায় পড়ে মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠানো আটকে যায়।

বিশ্বের মধ্যে মালয়েশিয়া অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী দেশ হিসাবে পরিচিত। তাদের অবস্থানের নিরিখে তারা আমাদের মতো দেশের কাছে অনেকটাই কাক্সিক্ষত। সেখানকার অর্থনীতি সবল থাকায় ভাগ্য পরিবর্তনের প্রত্যাশায় কাজের জন্য সেখানে যেতে আগ্রহী। আবার এই দেশের অনেক বিত্তবান দেশটিকে দ্বিতীয় হোম হিসাবে বেছে নিয়েছে। দেশটিতে কাজের ক্ষেত্রের প্রসারতাও এর অন্যতম একটি কারণ। কাজের সুযোগ থাকায় আমাদের দেশের  হাজার হাজার দক্ষ শ্রমিক সেখানে কাজে আগ্রহী। এসব দক্ষ শ্রমিকরা সুযোগের অপেক্ষায়। সেদেশে যাওয়ার সুযোগ পেলে নিজেদের কর্মদক্ষতার প্রমাণ দিতে সক্ষম হবে। এমনকি নিজেদের মেলে ধরার ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার ক্ষেত্র তৈরি হবে। আমাদের দেশের এসব  দক্ষ শ্রমিক  সেদেশের শ্রমিক সংকট  অবসানে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে। কিন্তু সেটির সম্ভাবনা অনেকটাই সুদূরপরাহত। তবে আমাদের সরকার আশায় বুক বেধেছেন সাম্প্রতিক সময়ে সেদেশের কয়েকজন মন্ত্রীর ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে। মালয়েশিয়ার মন্ত্রী যখন বলেন, তাদের দেশের শ্রমবাজার বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য খুলে দেওয়া হবে। তার আওতায়  সহজ শর্তে বাংলাদেশের  শ্রমিকরা দেশটিতে কাজের জন্য যেতে পারবে। 

বাংলাদেশি নাগরিকদের কাজের সুযোগ করে দেওয়ার ক্ষেত্রে মালয়েশিয়া যে সিদ্ধান্তহীনতায় ছিল, মনে হয় সেই অচল অবস্থার অবসান হতে যাচ্ছে। এতে নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে। ঢাকায় সফররত মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রী কুলাসেগেরান গত  রোববার দেখা করেছেন আমাদের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান আহমদ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেনের সঙ্গে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রী গৃহকর্মী নেওয়ার আগ্রহের কথা ব্যক্ত করেছেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশিদের জন্য দ্রুত শ্রমবাজার খুলতে আগ্রহী বলে জানান। আমরা চাই মালয়েশিয়ার এই ইচ্ছের দ্রুত বাস্তবায়ন হোক। এতে কোনো কালবিলম্ব যেন না হয়। অন্যদিকে মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রী আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় তুলে ধরে মালয়েশিয়ায় মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। সেটি হলো অনিবন্ধিত বাংলাদেশিদের বৈধ করার অনুরোধ ।

আমরা আশা করবো আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অনুরোধটি মালয়েশিয়া সরকার আমলে নেবে। যেসব বাংলাদেশি নাগরিক ওই দেশটিতে কাজ করছেন কিন্তু অনিবন্ধিত অবস্থায় রয়েছেন তাদের জন্য এটি একটি সুখবর হিসাবে বিবেচিত হবে।  এতে আমাদের শ্রমিকদের অনিশ্চিতর কালো মেঘ দূরীভূত হবে। আমরা প্রত্যাশা করি তাদেরকে দ্রুত নিবন্ধিত করে তার অনিশ্চয়তা অবসানে কার্যকর পদক্ষেপ মালয়েশিয়া সরকার গ্রহণ করবে।   তবে বিষয়টি বাস্তবায়নে আমাদের সরকারকেও আরো সক্রিয় হতে হবে বলে আমরা মনে করি। 

বর্তমানে মালয়েশিয়া অনেক বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করেন। কিন্তু অনেকে রিক্রুিটং এজেন্সির প্রতারণায় পড়ে দেশটিতে গিয়ে প্রতিকূল অবস্থায় পড়েছেন। এসব রেমিটেন্স যোদ্ধারা মালয়েশিয়া সরকারের আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধরা পড়ার ভয়ে  প্রতিদিন লুকিয়ে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। পরিস্থিতি উত্তরণের পথ খুঁজে বের করতে হবে। আবার বহু বাংলাদেশি শ্রমিক কাজের বিনিময়ে সঠিক মজুরি পান না, এটা দেখভালের কেউ নেই। সেটি দেখভালের বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি।  আরো জরুরি বিষয় হলো- বাংলাদেশে যেসব রিক্রুটিং এজেন্সি রয়েছে, এদের সিন্ডিকেট রয়েছে। এই সিন্ডিকেট করে এরা বিদেশে লোক পাঠানোর নামে অতিরিক্ত টাকা নিয়ে থাকে। এটি গণমাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে লেখালেখি হলেও এর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। কেন নেওয়া হয়নি তা আমরা বুঝে উঠতে পারি না। কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে যারা ভূমিকা পালন করবেন, তারা কী দিবানিদ্রায়  সেটিও প্রশ্নবোধক। বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ে ভেবে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।  
মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রী তার দেশে গৃহকর্মী নেওয়ার কথা বলেছেন। এতে আনন্দিত হওয়ার বিষয় জড়িত আছে। কারণ দেশে বহু নারী বিদেশে গিয়ে কাজ করে সংসারে সচ্ছলতা আনতে চান। তারা কঠোর পরিশ্রমে ভীতু নন। তারা মালয়েশিয়ায় যাওয়ার সুযোগ পেলে বাড়িঘর বিক্রি করে হলেও যেতে চাইবে। কিন্তু যেসব রিক্রুটিং এজেন্সি তাদের পাঠানোর দায়িত্ব নেবে,  সেসব এজেন্সি নারী শ্রমিকদের সঙ্গে যাতে প্রতারণা করতে না পারে তারও নিশ্চয়তা নিশ্চিত করতে হবে।বেশির ভাগ রিক্রুট এজেন্সি লোক পাঠানোর জন্য প্রকৃত অঙ্কের টাকার চেয়ে দিগুণ তিনগুণ টাকা হাতিয়ে নেয়। এটা মনিটরিং করা না গেলে প্রতারণা থেকে এসব রেমিটেন্স যোদ্ধাদের রক্ষা করা সম্ভব নয়।  আবার বিভিন্নভাবে বিদেশে আদম পাচার করার একটি সূক্ষ্ম নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠেছে। যারা মানুষকে পাচার করে বিভিন্নভাবে হয়রানি করে থাকে। অনেক সময় তাদের মৃত্যুর মতো ঘটনা বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশ পায়। এদিকটাও সরকারকে নজরে এনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। প্রকৃত টাকার থেকে বেশি টাকা নিলে তার জন্য কঠোর শাস্তি হওয়া যেমন দরকার, তেমনি আদম পাচারের মতো জঘন্য কাজে যারা লিপ্ত তাদেরকেও আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দুঃখজনক ঘটনার মুখোমুখি হয়েছি। সৌদি আরবে অনেক নারী শ্রমিক কাজ করতে গিয়ে ভয়ানক যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ইতোমধ্যে বহু নারী যৌন হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রাণটা হাতের মুঠোয় নিয়ে একেবারে খালি হাতে দেশে ফিরেছেন। এতে দেশের মধ্যেই সমালোচনার ঝড় উঠেছে। মালয়েশিয়ায় গৃহকর্মী পাঠিয়ে পরিস্থিতি যেন সৌদি আরবের মতো না হয় সেদিকেও সংশ্লিষ্টদের নজর দিতে হবে।

পরিশেষে আমরা, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তটি দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানাই। একই সাথে যেসব রিক্রুটিং এজেন্সি প্রতারণার আশ্রয় নেবে বা অতিরিক্ত টাকা নিয়ে শ্রমিক পাঠাবে তাদেরকে কঠোরতর শাস্তির আওতায় আনার দাবি তুলছি। 

Ads
Ads