সিঙ্গেল ডিজিট সুদহার বিনিয়োগবান্ধব 

  • ২৫-ফেব্রুয়ারী-২০২০ ০৪:১৬ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

ব্যাংক ঋণে সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে কার্যকর করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ফরমান জারি করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলারে বলা হয়েছে, ক্রেডিট কার্ড ছাড়া অন্য সব ব্যাংক ঋণের সুদহার সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ নির্র্ধারণ করা হলো। আর প্রি-শিপমেন্ট রফতানি ঋণের বিদ্যমান ৭ শতাংশ সুদহার অপরিবর্তিত থাকবে। এভাবে সুদহার ধার্য করার পরেও কোনো ঋণ গ্রহিতা খেলাপি হলে যে সময়ের জন্য  খেলাপি হবে অর্থাৎ মেয়াদি ঋণ বা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে  খেলাপি কিস্তি এবং চলতি মূলধন ঋণের  ক্ষেত্রে, মোট খেলাপি ঋণের ওপর সর্বোচ্চ ২ শতাংশ হারে দণ্ড সুদ আরোপ করা যাবে। এর বাইরে অন্য কোনো সুদ আরোপ করা যাবে না। আর চলতি বছর থেকে ব্যাংকের মোট ঋণের স্থিতির মধ্যে এসএমইর উৎপাদনশীল শিল্পখাতে পূর্ববর্তী তিন বছরের গড় হারের চেয়ে কোনোভাবেই কম হতে পারবে না।  আগামী ১ এপ্রিল থেকে তা কার্যকরের সময়সীমা বেধে দেওয়া হয়েছে এই নির্দেশে। দেশের সকল ব্যানিজিক ব্যাংক ও সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংকে সুদের এই হার বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়ে ইস্যু করা প্রজ্ঞাপণের মাধ্যমে  গ্রাহকদের দীর্ঘদিনের দাবি বাস্তবায়িত হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক অনেক হিসাব নিকাশ করেই এই সিদ্ধান্তে এসেছে । সিঙ্গেল ডিজিটে এই সুদের হার দেশের অর্থনীতির জন্য যেমন আশীর্বাদ তেমনি ব্যবসায়ীও বিনিযোগকারীদের জন্য আশীর্বাদস্বরুপ। অতীতে দীর্ঘদিন ধরেই সিঙ্গেল ডিজিটে সুদের হার বাস্তবায়নের কথা শুনা গেলেও ব্যাংকের অনীহার কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি। অথচ সিঙ্গেল ডিজিটে সুদের হার প্রয়োগ করতে ব্যাংকসমূহের যে আর্থিক ক্ষতির কথা বলা হয়েছে তার জন্য সরকার অনেক টাকা প্রণোদনা দিয়েছে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এসব প্রণোদনা এবং সুযোগ সুবিধা ভোগ করেও সিঙ্গেল ডিজিটে সুদ বাস্তবায়নের বিষয়ে নানা ধরনের টালবাহানা করে এসেছে। এবারে বাংলাদেশ ব্যাংক কঠোর  ঘোষণার মাধ্যমে তা আগামী ১ এপ্রিলের ভিতরে কার্যকরের নির্দেশ দিয়েছে। নির্ধারিত সময়ের ভিতরে ব্যাংকসমূহ এই আদেশ কার্যকরে ব্যর্থ হলে বা বাস্তবায়নে অনীহার প্রমাণ মিললে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের কথাও এই নির্দেশনায় বলা হয়েছে। 

বিশ্বের সব দেশের ভিতরে একমাত্র বাংলাদেশ যেখানে সুদের হার বেশি। তার উপরে রয়েছে সুদের চক্রবৃদ্ধি বিষয়টি। আমাদের অর্থমন্ত্রী অতি সম্প্রতি ্এ বিষয়ে উষ্মা প্রকাশ করে বলেছেন, বিশে^র কোনো দেশেই চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ আদায়ের নিয়ম নেই। আমাদের দেশে এই বিধান রোধ করা জরুরি। একই সাথে তিনি সুদের উচ্চহার নিয়েও কথা বলেছেন। তিনি সুদের হার কমানোর পরামর্শ দিয়েছেন। আবার  খেলাপি ঋণের কালচার কিভাবে বন্ধ করা যেতে পারে সে বিষয়টি উদ্ভাবনের জন্য তিনি অর্থনীতিবিদদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। অর্থনীতিবিদ বলতে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিষদের দায়িত্বের প্রতি তিনি ইংগিত করেছেন। বর্তমান সরকারের আমলে দেশের অর্থনীতির গ্রাফ উর্ধ্বমুখী। বেড়েছে বিদেশ থেকে আসা রেমিটেন্স। সরকারও বিভিন্নভাবে উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে সমৃদ্ধ অর্থনীতি গড়ে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। বলিষ্ঠ অর্থনীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কেবল প্রতিবেশিদেরকেই টেক্কা দেয়নি এখন দক্ষিণ এশিয়ার ভিতরে অর্থনীতির ক্ষেত্রে সফলতম বলে বিবেচিত হচ্ছে। আমাদের জিপিডির হার সে কথার স্বপক্ষে বড় সাক্ষ্য দিচ্ছে। বিদেশি বিনিয়োগের পাশাপাশি দেশীয় বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে ব্যাংক ঋণের কার্যকর ভূমিকা রয়েছে। অনেক বিনিয়োগকারী যারা ব্যাংকের টাকা লুটপাটে বিশ্বাসী নয় তারা ব্যাংকের ঋণ নিয়ে শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।

তাদের বক্তব্য ঋণের টাকার উচ্চসুদ দিয়ে ব্যবসা করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। ব্যবসায় যে মুনাফা অর্জিত হবে তা ব্যাংকের সুদ শোধ দিতে গেলে তাদের পকেটে আর কোনো উদ্বৃত্ত থাকে না। আবার অনেক সময় প্রাকৃতিক বা অন্য কোনো কারণে কিস্তি ফেল হলে যেভাবে দণ্ড সুদ ব্যাংক আদায় করে তাতে নিজেদের ভিটেমাটি নিলাম হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যারা ব্যাংকের টাকা নিয়ে ইচ্ছে করেই শোধ না করে খেলাপি হন তাদের জন্য ব্যাংকের ঋণ নেওয়া একেবারেই পানি পান্তার মতো। তারা নিশ্চিত জানে ব্যাংকের টাকা কোনো সময়ই শোধ করতে হবে না। উপরন্তু বিভিন্নভাবে তারা ঋণের টাকা মওকুফের সুযোগ পাবেন। এই বিশ^াসের মূলে রয়েছে ব্যাংকের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা কর্মচারীরা। তারা বিভিন্নভাবে উৎকোচ নিয়ে ব্যাংকের টাকা লোপাট করতে সহায়তা দিয়ে থাকে। যারা টাকা  নেন অনেক সময়ই তারা জাল কাগজপত্র জমা দিয়ে থাকেন। পরবর্তীতে খেলাপির দায়ে মটগেজ দেওয়া সম্পত্তি বিক্রি করতে গেলে বিপত্তি ঘটে। এজন্য ব্যাংকের লোকসান গুণতে হয়। ঋণ অনাদায়ী  থাকে  ফলে অর্থনীতির উপর বিরুপ প্রভাব পড়ে। 

আমরা মনে করি, বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিঙ্গেল ডিজিট সুদাহার বাস্তবায়িত হলে প্রকৃত বিনিয়োগকারীরা উৎসাহিত হবেন। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণের কালচার বন্ধ হবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। দেশের অর্থনীতিকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে অবশ্যই খেলাপি ঋণ কালচারের অবসান ঘটাতে হবে। সেই সাথে প্রকৃত বিনিয়োগকারী এবং ব্যবসাদারেরা যাতে ঋণ পান তাও নিশ্চিত করতে হবে। একই সাথে প্রয়োজন ঋণ গ্রহিতার ওপর থেকে সুদের চাপ কমানোর বিকল্প নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই প্রজ্ঞাপণ ঋণ গ্রহিতার জন্য আশার আলো জ¦ালাবে বলে আমরা বিশ^াস করি। সিঙ্গেল ডিজিটের এই সুদহার কার্যকরে সরকার এবং ব্যাংক কর্তৃপক্ষ আন্তরিক হবেন বলে আমাদের প্রত্যাশা ।    

Ads
Ads