৭ মার্চকে জাতীয় দিবস ঘোষণায় অভিনন্দন

  • ২৬-ফেব্রুয়ারী-২০২০ ০৪:১২ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

ঐতিহাসিক ৭ মার্চকে জাতীয় দিবস ঘোষণা করে দেশের সর্বোচ্চ আদালত এক রায় দিয়েছেন। আমরা আদালতের এই সিদ্ধান্তকে অভিনন্দন জানাই। একই সঙ্গে আদালতের সকল পর্যবেক্ষণ এবং নির্দেশনা অবিলম্বে বাস্তবায়নের দাবি জানাই। কারণ ৭ মার্চ বাঙালির জাতীয় জীবনে একটি মাইলফলক। এই দিনটি তাই বাঙালি জাতির কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। আদালত বিষয়টি সেভাবেই বিবেচনা করায় আমরা তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা। 

বাংলাদেশের স্থপতি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭ মার্চে রেসকোর্সের ময়দানে দাঁড়িয়ে স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন। এই ভাষণের ফলে বাঙালির আর বুঝতে বাকি থাকেনি যে এবার তাদেরকে স্বাধীনতার যুদ্ধে লড়তে হবে। বর্বর পাকিস্তানি জান্তা সরকারের সৈন্যদের সঙ্গে লড়াই করেই বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে ছিনিয়ে আনতে হবে। নয় মাস মরণপণ লড়াই করে দেশকে স্বাধীন করে বীর বাঙালি। ৩০ লাখ শহীদ ও দু’লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে দেশ স্বাধীন হয়। স্বাধীনতার অর্ধ শতাব্দী পরে এসে গত মঙ্গলবার হাইকোর্ট এক রুলে ৭ মার্চকে ‘জাতীয় ঐতিহাসিক দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে এক মাসের মধ্যে গেজেট প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছেন। হাইকোর্টের এই রুলকে আমরা অভিবাদনও অভিনন্দন জানাই। সেই সঙ্গে ৭ মার্চ বাঙালির চেতনার মাইলফলক হাইকোর্টের ঘোষণায় তারই স্বীকৃতি এসেছে। আমরা একই সঙ্গে বিশ^াস করি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাংলাদেশের স্থপতি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ছাড়া এ দেশ আদৌও স্বাধীন হতো না। সেই মহান নেতাই এইদিন আমাদের স্বাধীনতার স্বপ্ন প্রত্যেক বাঙালির ঘরে রোপণ করে দিয়েছিলেন। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর সেই সোনালি ফসল বাংলার ঘরে প্রতিষ্ঠা পায়। তার ডাকেই আমরা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ি, শত্রুর মোকাবিলা করে লাল-সবুজ পতাকা ছিনিয়ে আনি। তিনিই দেশকে স্বাধীন করতে এই দিনে ঔদ্ধার্ত আহ্বান জানান। সেই ঐতিহাসিক দিনটি হচ্ছে ৭ মার্চ।  জাতির জনকের ঋণ বাঙালি জাতি যুগ যুগ, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে স্মরণ করবে। দিন যতোই সামনে আগাবে তার কথা, তার সংগ্রাম আমাদের সামনে থেকে পথ দেখাবে। তারই আলোয় আমরা সুন্দরের দিকে ক্রমান্নয়ে চলতে থাকব। ৭ মার্চকে ‘জাতীয় ঐতিহাসিক দিবস’ ঘোষণা করা জাতির জনকের প্রতি শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার প্রকাশ যা জাতিকে নতুনভাবে পথ চলতে সাহায্য করবে। আদালত কেবল দিনটির স্বীকৃতি দিয়েই তাদের দায় শেষ করেনি একই সঙ্গে তারা বেশ কিছু পর্যবেক্ষণ দিয়েছে। হাইকোর্টের এই পর্যবেক্ষণও গুরুত্বপূর্ণ।

আদালত মুজিববর্ষের মধ্যেই দেশের সব জেলা-উপজেলায় বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল স্থাপনের নির্দেশনা দিয়েছেন। এটা যথাযথ ভাবে বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়ায় আমরা আশা করতে পারি নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সারা দেশের সব জেলা উপজেলা সমূহে জাতির জনকের ম্যুরাল প্রতিষ্ঠা পাবে। যা বাস্তবায়িত হলে জাতির জনকের প্রতি জাতীর ভালোবাসা চূড়ান্তভাবে প্রদর্শন করা যাবে। একই সঙ্গে আদালত বলেছেন, রেসকোর্সের ময়দানের যেখানে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণ দিয়েছেন, সেই ভাষণের স্থানটি চিহ্নিত করতে হবে। বিভিন্ন সরকারের আমলে যা চিহ্নিত করা হয়নি বলে আদালত তার পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে সরকারের এই অনীহায় আদালত অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে। স্থানটি স্মরণীয় করে রাখার আদালতের নির্দেশকে আমরা স্বাগত জানাই। সংরক্ষিত না থাকার কারণে স্থানটি উপেক্ষিত রয়ে গেছে। আমাদের নতুন প্রজন্ম এই স্থানটিতে এসে উপলদ্ধি করতে ব্যর্থ হয় সেদিনের সেই উদ্দীপনা আর স্বাধীনতা প্রত্যাশি বাঙালির আবেগ উচ্ছ্বাসের কাহিনী। স্থানটি চিহ্নিত করা থাকলে তারা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট সর্ম্পকে যেমন জ্ঞাত হবে, পাশাপাশি তার সঠিক ইতিহাস জানতে পারবে। গর্বের সঙ্গে তারা বলতে  পারবে জাতির জনক এখানে দাঁড়িয়ে ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ দিয়েছিলেন। এখানে দাঁড়িয়ে তিনি স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন। আর এটিই আমাদের স্বাধীনতার সুতিকাগার। ফলে এ স্থানটির গুরুত্ব অপরিসীম। একে সংরক্ষণ এবং স্মরণীয় করে রাখা জাতির কর্তব্য। 

দুঃখজনক হলো, সেনাশাসক জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কুক্ষিগত করে মানুষের মন থেকে স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধের সব কীর্তি মুছে ফেলার উদ্যোগ নেন। তার প্রাথমিক পাঠ হিসাবে রেসকোর্স মাঠকে পাল্টে তৈরি করেন শিশু পার্ক। ঐতিহাসিক স্থান ধ্বংস করতে বৃক্ষশোভিত করে তোলা হয়। শিশুপার্ক বানিয়ে রেসকোর্স মাঠকে পরিবর্তন করা হয়। জিয়া ছিলেন পাকিস্তানি ভাবাপন্ন। ক্ষমতায় এসে একাত্তরের ঘাতকদের খুজে রাজনীতিতে নামার সুযোগ করে দেন। পাকিস্তানপন্থি জামায়াত, মুসলিম লীগসহ অন্যান্য দলকে নিজেদের দিকে টেনে আনেন। এরা সবাই ছিল স্বাধীনতা বিরোধী। জিয়া ক্ষমতায় এসে জাতির জনককে মুছে ফেলার চেষ্টা চালান। তার নাম পর্যন্ত কোথাও নেওয়াটা ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। জিয়ার এমন কর্মকা- যে মোটেই গ্রহণযোগ্য ছিল না, পরবর্তীতে ইতিহাস সেটা প্রমাণ করেছে। জোর করে ইতিহাসকে পরিবর্তন করা যায় না এই সত্যটি ইতিহাস তাদেরকে বারবার শিখিয়ে দিয়েছে। সকল প্রতিবন্ধকতাকে উপেক্ষা করে জাতির জনক সেই দুঃসময়ে বাঙালির মানসপটে উজ্জ্বল থেকেছেন।

তাই স্বাধীনতার এতো বছর পরে এসে মহামান্য হাইকোর্ট যে রুল জারি করেছেন, সেটি বাংলাদেশের স্বর্ণাক্ষরে ক্ষুদিত হয়ে থাকবে।    
পরিশেষে আমরা বলতে চাই, ৭ মার্চকে ‘জাতীয় ঐতিহাসিক দিবস’ ঘোষণা করায় বঙ্গবন্ধুর প্রতি আমাদের ভালোবাসা-শ্রদ্ধা আরো গভীরভাবে নিবেদন করার সুযোগ পাবো। এবং প্রতিটি জেলা-উপজেলায় কমপ্লেক্সে বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল স্থাপনের মাধ্যমে শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের এক মহাসুযোগ আদালত তৈরি করে দিয়েছে। তবে দায়িত্ব এখন সরকারের। আমরা মনে প্রাণে প্রত্যাশা করি হাইকোর্টের নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালনে কতৃর্পক্ষ দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেবে।  

Ads
Ads