মুজিববর্ষকে সামনে রেখে বইমেলা খুবই গুরুত্বপূর্ণ

  • ২৮-ফেব্রুয়ারী-২০২০ ০২:৪৭ অপরাহ্ন
Ads

শেষ সময়ে এসে আরো জমে উঠেছে প্রাণের বইমেলা

:: আরিফুর রহমান ::

অমর একুশে গ্রন্থমেলার ২৬তম দিন ছিল গতকাল বৃহস্পতিবার। বাঙালির প্রাণের উৎসব বইমেলার বিদায়ঘণ্টা বাজতে শুরু করেছে। লেখক-পাঠক-প্রকাশকের এ মিলনমেলার ইতি ঘটবে আগামীকাল শনিবার ২৯ ফেব্রুয়ারি। বলতে গেলে, সফলতার মধ্য দিয়েই শেষ হতে যাচ্ছে বিশাল এ আয়োজন। চমৎকার এ উৎসবকে কিভাবে দেখছেন কবি-লেখকরা। আর মেলার শেষ সময়ে এসে আরো জমে উঠেছে প্রাণের বইমেলা।

খ্যাতিমান শিশুসাহিত্যিক খালেক বিন জয়েন উদদীন ভোরের পাতাকে বলেন, ‘এবছর বইমেলা খুবই সুশৃঙ্খলভাবে হয়েছে। স্টল ও প্যাভিলিয়ন সাজানোও ভালো হয়েছে। কোনো ঝামেলা হয়নি। আর মুজিববর্ষকে সামনে রেখে এ বছরের বইমেলা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বাংলা একাডেমিসহ অন্যান্য প্রকাশনী বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গবন্ধুবিষয়ক বই প্রকাশ করে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।’

দেখা হল নাট্যকার ও লেখক ইসাহাক খান সঙ্গে। তিনি ভোরের পাতাকে বলেন, ‘এবারের মেলাটি একটু ভিন্ন রকম। মেলার পরিবেশ ও আয়োজন অন্যবারের চেয়ে ব্যতিক্রম। তাই বাংলা একাডেমি ধন্যবাদ পেতেই পারে। তবে পাঠকের আগ্রহ কম পরিলক্ষিত হয়েছে। তুলনামূলকভাবে কম বেচাকেনা হয়েছে। জনপ্রিয় লেখকদের বইয়ের কাটতির বাইরে সাধারণ লেখকদের বইয়ের কাটতির পরিমাণ খুব কম। দুঃখের বিষয়, মেলায় মৌসুমী প্রকাশকরা স্টল পেয়ে থাকেন; যারা সারাবছর বই করেন না। বইমেলার সময় কিছু লেখকের বই করে তারা মেলায় আসেন। আবার অনেকেই শুধু লেখক হওয়ার মানসিকতা নিয়েই বই বের করেন।’

কবি ও প্রাবন্ধিক মোহাম্মদ নূরুল হক এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘অন্য যেকোনো বারের চেয়ে এবারের মেলার পরিসর যেমন বেড়েছে, তেমনি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নও। মূলমঞ্চের পাশাপাশি ‘লেখক বলছি’ অনুষ্ঠানটি এবার আরও বড় পরিসরে হওয়ায় অধিকসংখ্যক লেখক-পাঠক একসঙ্গে একত্রিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। তারা নিজেদের মতবিনিময়ের সুযোগ পাচ্ছে। বিষয়টি ইতিবাচক। এবারের মেলার সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ও ইতিবাচক দিক হলো লিটলম্যাগ কর্নারকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নিয়ে আসা। এতে পরিসর বড় হওয়ায় লিটলম্যাগকর্মী-লেখক-পাঠকরা স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরার সুযোগ পাচ্ছেন। আর একটি কথা, রাষ্ট্রে যেহেতু ধূমপান নিষিদ্ধ করা হয়নি, সেহেতু ধূমপায়ীদের জন্য ‘স্মোকিং জোন’ করা দরকার ছিল বলে মনে করি। তাহলে আর অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটার কোনো আশঙ্কা থাকতো না। এটুকু ছাড়া, এবারের বইমেলার সার্বিক পরিবেশ ভালোই বলতে হবে।’

গল্পকার, প্রাবন্ধিক ও ঔপন্যাসিক মোজাফ্ফর হোসেন এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘আয়োজনের দিক থেকে অন্যবারের চেয়ে গোছানো। দৃষ্টিনন্দন। আর প্রকাশনার দিক থেকে মনে হয়েছে এবারের গ্রন্থমেলায় তরুণদের পাঠকপ্রিয়তা বেড়েছে। তরুণদের গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, গবেষণা—সব ক্ষেত্রেই এগিয়ে যাওয়ার বিষয়টি এবার চোখে পড়ার মতো। পাঠক এখন সাহিত্যে নতুন ধরনের কণ্ঠস্বর খুঁজছে।’

কবি, কথাশিল্পী ও অনুবাদক রাকিবুল রকি এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘এবারের বইমেলার পরিসর আগের চেয়ে অনেক বেশি ছিল। তাই এর নান্দনিক সৌন্দর্য চোখে পড়ার মতো। অন্যান্য বারের তুলনায় খাবারের স্টলও ছিল বেশি। কিছু দূর দূর চায়ের স্টল। ফলে ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে গেলে বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগটা ভালো ছিল। এ জন্য বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ। এবার সাহিত্যের পাশাপাশি অন্যান্য বই, যেমন- মোটিভেশনাল, ধর্মীয় ইত্যাদি বইয়ের বিক্রি ছিল চোখে পড়ার মতো। তবে তরুণ সাহিত্যিকদের বই বিক্রিও বেশ ভালো ছিল। সাহিত্যের বইয়ের তুলনায় অন্যান্য বইয়ের বিক্রিতে যারা হতাশা ব্যক্ত করেছেন, তাদের উদ্দেশে বলবো, ভালো বইয়ের কদর সব সময় ছিল। থাকবে। কিন্তু লিটলম্যাগ কর্নারে এবার ক্রেতার স্বল্পতা ছিল চোখে পড়ার মতো।’

তরুণ লেখক কিঙ্কর আহসান এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘বইমেলা গোছাতে গিয়ে আরও কিছুটা অগোছালো হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। কোন স্টল কোন দিকে সেটা বোঝা কঠিন ছিল। মেলায় খাবারের দোকানগুলো যেন জরুরি হয়ে উঠেছে। বেশি দামে সেখানে খাবার বিক্রি হচ্ছে। একটা বড় অংশের মানুষের জমায়েত দেখা গেছে খাবারের দোকানগুলোর চারপাশে। বইয়ের প্রয়োজনটা হওয়া উচিত সবচেয়ে বেশি। প্রকাশনার সংখ্যা বাড়িয়ে কিংবা খাবারের স্টল বাড়িয়ে পাঠকদের আনা যাবে না। ভালো বই, সঠিক প্রচারণা এবং পরিশ্রমী প্রকাশকদের সাথে মিলে সততার জায়গা থেকে মেলার জন্য কাজ করতে হবে। তবে আনন্দের খবর হচ্ছে, পাঠকরা প্রচুর বই কিনছে। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের ভিড় বেড়েছে। পাঠকদের বইয়ের প্রতি আগ্রহ আছে বলে মনে হচ্ছে। আগামী বইমেলা গোছানো হোক। লাখো মানুষের ভিড় হোক শুধু বইকে ঘিরেই।’

বই বিষয়ক ছোটকাগজ ‘এবং বই’র সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘এবারের মেলার পরিসর আগের চাইতে বেড়েছে। স্টল বিন্যাস সুন্দর ছিল। বিশেষত লিটল ম্যাগাজিন কর্নার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নিয়ে আসাটা একটি ভালো সিদ্ধান্ত বলে মনে করি। এরমধ্যে যে বিষয়টি বিরক্তিকর ছিল, তা হলো মেলায় ঢোকার সময় গায়ে হাত দিয়ে পুলিশের শরীর চেক করা। এক্ষেত্রে তারা ইলেক্ট্রনিক্স ডিভাইস ব্যবহার করতে পারতেন। পুলিশ জানতে চায়, সিগারেট বা দেয়াশলাই আছে কি-না? নিরাপত্তা বাহিনীর কাজ কি এসব দেখা? না-কি সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা? ভবিষ্যতে আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি এ বিষয়ে নজর দেবেন, এটা প্রত্যাশা করি।’

কবি ও সম্পাদক মীর হেলাল এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘এবারের বইমেলা সার্থক মনে হয়েছে। জায়গার বিস্তৃতি ও নিরাপত্তায় সবাই খুশি। সুযোগ-সুবিধাও ছিল পর্যাপ্ত। প্রকাশনীর ছাড়িয়ে যাবার প্রতিযোগিতা চোখে পড়ার মতো। লিটলম্যাগ চত্বর মূলধারার সঙ্গে একিভূত হওয়ায় বাংলা একাডেমি প্রশংসা কুড়িয়েছে। এসব কারণেই এবারের মেলা বেশি টেনেছে। মানুষ বেশিবার গিয়েছে। এটাকে আমি জোয়ার বলবো।’

মুক্তমঞ্চের আয়োজন: বিকাল ৪টায় অনুষ্ঠিত হয় শামসুজ্জামান খান সম্পাদিত বঙ্গবন্ধু নানা বর্ণে নানা রেখায় শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আহমাদ মাযহার। আলোচনায় অংশ নেন সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল, এনামুল করিম নির্ঝর এবং আমীরুল ইসলাম। বক্তব্য প্রদান করেন গ্রন্থের সম্পাদক শামসুজ্জামান খান। সভাপতিত্ব করেন মাহফুজা খানম। প্রাবন্ধিক বলেন, বঙ্গবন্ধু নানা বর্ণে নানা রেখায় বঙ্গবন্ধু বিষয়ক বিচিত্র রচনার একটি সংকলন। সম্পাদকের ভাষায় ‘দুই পর্বে সাতটি অধ্যায়ে বিন্যস্ত একটি সুপরিকল্পিত সংকলন’। বেশিরভাগ রচনার রীতি অনুসরণ করলে ক্রমশ টের পাওয়া যায় যে কিশোর পাঠকদের উদ্দেশ্য করেই বইটি রচিত। প্রথম পর্বে রয়েছে ‘জীবনকথা ও মূল্যায়ন’। বইটির দ্বিতীয় পর্বের প্রথম অধ্যায়ে সংকলিত হয়েছে ছড়া-কবিতা ও গান। পরের অধ্যায়ে রয়েছে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কয়েকটি গল্প। গল্পগুলোর কোনো কোনোটায় বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ ও মুক্তিযুদ্ধ একাকার হয়ে গেছে। 

আলোচকরা বলেন, বঙ্গবন্ধু নানা বর্ণে নানা রেখায় গ্রন্থটি অত্যন্ত সুশোভিত, সুগ্রন্থিত এবং সুসম্পাদিত। গ্রন্থটির অবয়ব ও সংকলিত লেখাগুলো থেকে একে কিশোর পাঠকদের জন্য রচিত মনে হওয়াই স্বাভাবিক। গ্রন্থের প্রতিটি লেখাই তাৎপর্যপূর্ণ কেননা দেশের বিশিষ্ট কবি, সাহিত্যিক ও গবেষকগণ তাদের লেখায় বঙ্গবন্ধুকে নানা মাত্রায় এখানে উপস্থাপন করেছেন। স্কুল, কলেজ, গ্রন্থাগার এবং সরকারি- বেসরকারি শিশু সংগঠনগুলোর মাধ্যমে গ্রন্থটি শিশু-কিশোর তথা পাঠকদের হাতে পৌঁছে দিতে পারলে বাঙালির মহান নেতা বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে তাদের জানার পরিধি বৃদ্ধি পাবে। গ্রন্থের সম্পাদক বলেন, বঙ্গবন্ধুর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার প্রকাশ ঘটেছে বঙ্গবন্ধু নানা বর্ণে নানা রেখায় বইয়ে। 

সভাপতির বক্তব্যে মাহফুজা খানম বলেন, কেবল কিশোর পাঠক নয়, বঙ্গবন্ধু বিষয়ক স্মৃতিচারণ, ছড়া, কবিতা, গল্প ও জীবনপঞ্জি সংবলিত এ গ্রন্থটি সকল বয়সের পাঠকদের কাছে সমাদৃত হবে। তিনি আরো বলেন, বঙ্গবন্ধু বিষয়ক গ্রন্থ প্রকাশের সময় আমাদের বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে তাঁকে আমরা যথার্থ উচ্চতায় উপস্থাপন করছি কিনা। এ ধরনের গ্রন্থ প্রকাশের পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষের ক্ষণটিকে সার্বজনীনভাবে উদ্যাপনের জন্য আমাদের নানামুখী উদ্যোগ নেওয়া উচিত। 

আজকের বইমেলা: অমর একুশে গ্রন্থমেলার আজ শুক্রবার ২৭তম দিন। মেলা চলবে সকাল ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। মেলায় ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত থাকবে শিশুপ্রহর। বিকাল ৪টায় অনুষ্ঠিত হবে আবুল কাসেম রচিত বঙ্গবন্ধুর অর্থনৈতিক উন্নয়নদর্শন: জাতীয়করণনীতি এবং প্রথম পঞ্চমবার্ষিক পরিকল্পনা  শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ পাঠ করবেন অসীম সাহা। আলোচনায় অংশ নেবেন এম এম আকাশ এবং নাসিমা আনিস। সভাপতিত্ব করবেন আতিউর রহমান। সন্ধ্যায় রয়েছে কবিকণ্ঠে কবিতাপাঠ, আবৃত্তি এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

Ads
Ads