নতুন প্রজন্মকে চেনাতে হবে অগ্নিঝরা মার্চকে

  • ১-মার্চ-২০২০ ০৪:০১ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

শুরু হয়েছে অগ্নিঝরা মার্চ। গতকাল রোববার থেকে দিনটি শুরু হয়েছে। মার্চকে ঘিরে কত ঘটনাপ্রবাহ। বাঙালি জাতির স্বাধীনতার স্বপ্নের ডানাকে স্পর্শ করতে এ মাসের অবদান চিরস্মরণীয় থাকবে বাঙালির চিত্তে। ৭ মার্চ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু তার সেই ঐতিহাসিক ভাষণটি দেন। রেসকোর্স ময়দানে এদিন তিনি মুক্তি আর স্বাধীনতার ডাক দেন। অন্যদিকে সামরিক জান্তা ইয়াহিয়ার ১ মার্চের ঘোষণায় ফেঁটে পড়ে সারা বাংলার মানুষ। আবাল- বৃদ্ধবনিতা সবার হৃদয় ক্ষোভে জ্বলে ওঠে। আর নয়, আর নয়, এবার স্বাধীনতা, স্বাধীনতা, বাংলাদেশের স্বাধীনতা, রক্তিম ফুল হাতে চাই। তাইতো সেøাগান আছড়ে পড়ে, বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো বাংলাদেশ স্বাধীন কর।  তোমার আমার ঠিকানা/পদ্মা মেঘনা যমুনা/জয় বাংলা।

ইয়াহিয়ার ১ মার্চের ঘোষণার সে দিনই দেশজুড়ে শুরু হওয়া সর্বাত্মক বিক্ষোভ আর প্রতিরোধের আন্দোলন। যার ধারাবাহিকতায় সূত্রপাত অসহযোগ আন্দোলনের। একপর্যায়ে পূর্ব পাকিস্তানের ওপর পশ্চিমা সামরিক জান্তার নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণই অকার্যকর হয়ে পড়ে। প্রকৃত কর্তৃত্ব চলে যায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে। এরপর ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু যে ঘোষণা দেন, তা স্বাধীনতা সংগ্রামের পথে আরও সুনির্দিষ্টভাবে এগিয়ে নিয়ে যায় জাতিকে। ইস্পাত কঠিন সুদৃঢ় ঐক্যে নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করতে শুরু করে গোটা জাতি।

মূলত ১৯৭১ সালের ১ মার্চ থেকেই বাঙালির ধারাবাহিক স্বাধীনতা সংগ্রামের শেষ ধাপের প্রতিরোধের শুরু হয়। আর পেছনে ফিরে তাকানো কোনো অবকাশ খুঁজে পায়নি বাঙালি জাতি। কিন্তু এই স্বাধীনতা অর্জনে কতো বাধা-বিঘœ-রক্তপাত, মা-বোনের সম্ভ্রম, শহীদের আত্মহুতি-নতুন প্রজন্মকে জানতে হবে এবং জানাতে হবে। সর্বাগ্রে জানা দরকার জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। কতো জেলজুলম-অত্যাচার সহ্য করে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন। এটা ভাবলেই শিহরিত হতে হয়, জাতির জনকের এই আত্মদান, বাংলার প্রতি, বাংলার মানুষের প্রতি, তার অগাধ-গভীর ভালোবাসা, তা ভুবনজুড়ে আর কোথাওটি খুঁজে পাওয়া যাবে না। 

মার্চের প্রতিটি ঘটনাপ্রবাহ ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। জাতির জনক কিভাবে বাংলার মানুষকে স্বাধীনতার দ্বারপ্রান্তে উপনীত করলেন, তার বিস্তারিত ইতিহাসের রয়েছে। কিন্তু খুবই পরিতাপের বিষয়, বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের ইতিহাস, ১৯৭১ এর মার্চের অগ্নিঝরা দিনগুলোর ইতিহাস, আমাদের মানসপট থেকে মুছে ফেলার ভয়াবহ হীন অপচেষ্টা চালানো হয়েছে। জাতির জনককে সপরিবারে হত্যার পর রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসে পাকিস্তানিদের প্রেতাত্মা। যারা স্বাধীনতার ঘোর বিরোধী ছিল। পাকিস্তানি সেনাদের দোসর ছিল সেই স্বাধীনতা বিরোধী ঘাতক জামায়াত, মুসলিম লীগ ভাবধারার ব্যক্তিরা বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতা কব্জা করে নেয়। প্রথমেই তারা জাতীয় সংবিধানের চারটি স্তম্ভকে উৎখাত করে। এরপর শুরু তাদের আসল রূপ দেখানোর খেলা। রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে পাকিস্তানপন্থিদেরকে বসানো হয়। জাতির জনকের নাম-গন্ধ শুছে ফেলে খুনি জিয়াকে বঙ্গবন্ধুর সমতুল্য করে তোলার হীনচেষ্টা চালানো হয়। জিয়াকে স্বাধীনতা ঘোষক বলে বহুপ্রমাণের অপচেষ্টা। বিএনপি নামক দরটি মেতে ওঠে স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধকে বিতর্কিত করার এক খেলায়। আগুনঝরা মার্চ নিয়ে দেশের বহু কবি সাহিত্যিক রচনা করেছেন অনেকে লেখা। যেমন---- স্বাধীনতা সংগ্রামের ঘোষণা দেওয়ার ওই দিনটি কেমন ছিল? সাতই মার্চের ওই দিনটির কাব্যভাষ্য রচনা করেছেন কবি নির্মলেন্দু গুণ- ‘শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে/রবীন্দ্র্রনাথের মতো দৃপ্ত পায়ে হেঁটে/ অতঃপর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন/তখন পলকে দারুণ ঝলকে তরীতে উঠিল জল/ হৃদয়ে লাগিল দোলা, জনসমুদ্রে জাগিল জোয়ার/সকল দুয়ার খোলা। কে রোধে তাহার বজ্রকণ্ঠ বাণী?/গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তার অমর-কবিতাখানি :‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম/এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’/সেই থেকে স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের।

পরিশেষে বলতে চাই, আগুন ঝরা মার্চের মর্মকে আমাদের হৃদয়ে গভীরতম স্থানে সঞ্চরিত করে জাতির জনকের সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্নকে বাস্তবিক করে তুলতে হবে। এতে কোনো ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। ক্ষমতা পেয়ে অনেকে বঙ্গবন্ধুর আর্দশ ভুলে গিয়ে ব্যক্তিস্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে চলছেন। ক্ষমতা ব্যবহার করে টাকা কামানোর রাস্তা খুঁজছেন। এদেরকে ক্ষমতা থেকে হটিয়ে দিতে হবে। যারা জাতির জনকের আদর্শবহির্ভূত কাজ করবে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আদর্শককে জলাঞ্জলি দিয়ে অপকর্মে লিপ্ত হবে- তাদের দল থেকে বের করে দিয়ে দেশপ্রেমিকদের দিয়ে দেশকে গড়তে হবে। আর মহান মার্চের এই অগ্নিঝরা দিনে বাঙালির এটাই দীপ্ত শপথ। 

Ads
Ads