মুজিববর্ষ পালন: বঙ্গবন্ধুকন্যার নির্দেশনার পূর্ণ বাস্তবায়ন কাম্য

  • ৪-মার্চ-২০২০ ০৪:২৬ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

মুজিববর্ষে জাতির জনকের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনে বড় বড় বাজেট না দিয়ে জাতীয় কমিটির সঙ্গে সমন্বয় করে কর্মসূচি নিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সবাইকে নির্দেশ দিয়েছেন। এ ছাড়া অহেতুক নতুন কর্মসূচি না নিয়ে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে নিজেদের বাজেট থেকে মানুষের কল্যাণ এবং দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে এমন কর্মসূচি ঘোষণারও নির্দেশনা দিয়েছেন সরকারপ্রধান। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে গত সোমবার মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠক শেষে অনির্ধারিত আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী এ নির্দেশনা দেন। সরকারের তরফ থেকে বলা হয়েছে, মুজিববর্ষ উপলক্ষে প্রত্যেকটা মন্ত্রণালয় ও বিভাগ তার একটা নোটেবল প্রোগ্রামকে মুজিববর্ষের প্রোগ্রাম হিসেবে ঘোষণা করবে, তার নরমাল বাজেট থেকে। আর যদি একসেপশনাল কোনো কাজ থাকে তার জন্য এক্সট্রা টাকা চিন্তা করা যেতে পারে। কিন্তু বড় বড় বাজেট দিয়ে নতুন কাজ করার দরকার নেই। কেন্দ্রীয় কমিটির সঙ্গে সমন্বয় করে প্রোগ্রাম নিতে বলা হয়েছে। আমরা জানি, বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ উদযাপনে গত বছরের ১৪ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রীকে সভাপতি করে একটি জাতীয় কমিটি এবং জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলামকে সভাপতি করে একটি বাস্তবায়ন কমিটি করেছে সরকার। এছাড়া বিষয়ভিত্তিক আটটি উপ-কমিটিও গঠন করা হয়েছে। মুজিববর্ষ পালনে যেন বাড়াবাড়ি না করা হয় সে ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে আগেই সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে। তবে কিছু কিছু জায়গায় মুজিববর্ষের কর্মসূচি পালনের নামে চাঁদাবাজি হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

আমরা প্রায়ই দেখি, রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নের অজুহাতে চাঁদাবাজি হচ্ছে। যারা রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনে নেতৃত্বদেন মূলত: তারাই এই অপকর্মটি করে থাকেন। ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে নিরীহ মানুষের কাছ থেকেও চাঁদা তোলা হয়। আর টাকাঅলারা মোটা দাগে চাঁদা দেন ক্ষমতাসীন সরকারের লোকজনকে তুষ্ট করার জন্য। সরকারি লোকজনের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকলে সহজেই অনেক কিছু বাগিয়ে নেওয়া সম্ভব, খাতিরের লোকজন বলে একটা কথা আছে না! এ কারণেই হরহামেশাই লক্ষ্য করা যায়, টাকাঅলারা সরকারি নানা কাজে, কর্মসূচিতে টাকা ঠালেন, তার একটি সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য থাকে। সরকারের কাছ থেকে বড় কিছু বাগিয়ে বা হাতিয়ে নেওয়াই যে এর মোক্ষম উদ্দেশ্য সেটা অকাট মূর্খরাও বোঝে। ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেছেন মুজিববর্ষ পালনে চাঁদাবাজির দোকান খুলে না বসতে।

মুজিবশতবর্ষ উপলক্ষে এরই মধ্যে একশ্রেণির লোক নানা ফন্দিফিকিরের পথ বের করে ফেলেছে। তারা নানা অজুহাতে পকেট ভারী করার অপকর্মে নেমে পড়েছে। এতে যে সরকার এবং দলের সুনাম নষ্ট হচ্ছে, সেটা তারা গায়ে মাখছেন না। এই পরিস্থিতি থেকে কিভাবে উত্তরণ সম্ভব, টাকাঅলারা টাকা ঢেলে সরকারি সম্পত্তি বা অন্যকিছু বাগিয়ে নিতে না পারে, সে ব্যাপারে সরকারের নীতিনির্ধারকদের ভাবতে হবে। আর কর্মসূচি পালনে যাদের অগ্রণী ভূমিকা থাকে তারাও যেন এ ব্যাপারে সাবধান হন, সেটির দিকেও বিশেষ নজর দিতে হবে। কেউ যেন কর্মসূচি পালনের অজুহাতে কারোর কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা বা চাঁদা আদায় না করে, তার প্রতি অবশ্যই নজর দিতে হবে। কারণ এসব কর্মকা- যারা করেন, তারা প্রকৃত অর্থে সরকার এবং দলকে ডুবানোর অপচেষ্টাই চালান। নানা কর্মসূচি পালনে রাজনৈতিক নেতা-কর্মী ছাড়াও সরকারি লোকজনও যে এটাকে ব্যবহার করে পকেট ভারি করে থাকে তাও সর্বমহল ওয়াকিবহাল। সুতারং প্রধানমন্ত্রী সঠিক নির্দেশনাটিই সময় মতো দিয়েছেন। দলের লোকজন মুজিবশতবর্ষ উপলক্ষে পকেট ভারী করার জন্য বিশাল বিশাল বাজেট দিয়ে মুজিব ভক্ত, বঙ্গবন্ধু ভক্ত, শেখ হাসিনা ভক্ত সেজে বসে থাকবেন না তার কি নিশ্চয়তা রয়েছে। 

রাষ্ট্রনায়ক, বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টানা ক্ষমতায় রয়েছেন। দেশকে বিশে^র বুকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বাংলাদেশ সবদিক দিয়েই অনন্য নজির স্থাপন করেছে। জাতির জনকের কন্যা দেশের গণতন্ত্রের বুনিয়াদকে মজবুত করেছেন। এশিয়ার মধ্যে শুধু নয় গোটা বিশে^ উন্নতির রোল মডেল হিসেবে বাংলাদেশ একটি দৃষ্টান্ত, সেই পর্যায়ে তিনি দেশকে নিয়ে গেছেন। এ অবস্থাতে প্রশাসনের অনেক বিএনপি-জামায়াত ঘেঁষা লোকজন রাতারাতি ভোল পাল্টে ফেলেছে। তারা এখন ‘মহা শেখ হাসিনা ভক্তে’ পরিণত হয়েছে। এমন কি প্রশাসনের সৎ-দক্ষ কর্মকর্তাদের পাশ কাটিয়ে নিজেদেরকে সামনে তুলে ধরার চেষ্টার কোনো কমতি নেই। এ জাতীয় লোক মুজিবশতবর্ষ উপলক্ষে বড় আকারের বাজেট দিয়ে তার পুরোটাই নিজেদের পকেটে পুরতে পারেন বলে ধরে নেওয়া যায়। ফলে এদের ব্যাপারে সরকারের নীতিনির্ধারকদের কঠোর হতে হবে। 

আরো মজার ব্যাপার হলো- আমলাদের প্রকৃত অর্থে কোনো চরিত্র নেই। বাইরে সে যে কোনো দল বা সরকারের মহাভক্ত বা প্রাণপাত করতেও প্রস্তুত এমনটি প্রকাশ করতে দেখা যায়। লক্ষ্যযোগ্য হলো, মুজিবশতবর্ষ পালন উপলক্ষে কেন্দ্রীয়ভাবে একটি কমিটি সরকার গঠন করেছে। এই কমিটিতে একজন বড় সাবেক আমলা রয়েছেন। তাকে বিশেষ মর্যাদাও দান করা হয়েছে। তিনি ছাত্রজীবনে অবশ্য কোনোদিন ছাত্রলীগ করেননি। ছাত্রজীবনে বামধারার ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে শোনা যায়। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো- তার চারপাশে কবি ফরহাদ মজহার ভক্তদের দেখা যায়। কট্টর ফরহাদ মজহার ভক্তদের জন্য এই ব্যক্তি বেশ উদার বলেও জানা যায়। সবাই জানেন, ফরহাদ মজহার, বিএনপি-জামায়াতের খাশলোক। ফলে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক যে মুজিবশতবর্ষ উদযাপনে ফরহাদ মাজহার ঘনিষ্ট ব্যক্তি পরিবেশিষ্টত একজন সাবেক আমলা কতটা আন্তরিকভাবে ভূমিকা রাখতে পারবেন। তবে এমনটা হতে পারে যে, ওই আমলা সরকারের খুবই আস্থাভাজন। এ কারণে তাকে গুরুদায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। 

পরিশেষে আমরা বলতে চাই, বর্তমান সরকার বা দলের অতিভক্তদের ব্যাপারে সরকারের নীতিনির্ধারকদের সচেতনতার পরিচয় দেওয়া প্রয়োজন। যারা প্রকৃত আওয়ামী লীগ এবং সরকারের হিতাকাক্সিক্ষ, তাদের ওপরেই দল এবং সরকার ভরসা করতে পারে। দীর্ঘকালব্যাপী যেসব ব্যক্তি দলের জন্য ত্যাগ স্বীকার করে এসেছেন, তারা কখনোই অতিভক্তের পরিচয় দেবে না। দলের ভাবমূর্তি বিনিষ্ট হোক তাও চাইবে না। আমরা আশা করবো- আওয়ামী লীগের প্রকৃত ত্যাগিব্যক্তিদেরকেই সরকার তার নানা কাজে সংশ্লিষ্ট করতে পারে। মুজিবশতবর্ষ পালনে এদেরই যেন প্রাধান্য বজায় থাকে- এমনটিই আমাদের প্রত্যাশা। সুবিধাভোগীরা যেন শত যোজন দূরে থাকে। সে ব্যাপারে নজর রাখতে হবে।

Ads
Ads