জামালগঞ্জে কৃষিতে সম্ভাবনার দুয়ার খুলছে সূর্যমুখী ফুল চাষে।

  • ৫-মার্চ-২০২০ ১০:৫২ পূর্বাহ্ণ
Ads

:: মো. বায়েজীদ বিন ওয়াহিদ, জামালগঞ্জ (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি ::

সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জে কৃষিতে ধানের পর এবার অধিক সম্ভাবনার দুয়ার খুলছে সূর্যমুখী চাষে। প্রথম বারের মত হাওর অ লের উঁচু জমিতে সূর্যমুখী ফুলের চাষ শুরু হয়েছে। হাওর অ লের উঁচু জমিতে সূর্যমুখি চাষের অপার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মন্তব্য কৃষি বিভাগের। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সার ও বীজ প্রণোদনার মাধ্যমে উপজেলার একাধিক কৃষক এই সূর্যমুখি ফুলের চাষ শুরু করেছে।

এ বছর জামালগঞ্জ উপজেলার রামপুর,শাহপুর,বাহাদুরপুর গ্রামের প্রায় ২৫ বিঘা জমিতে সূর্যমুখি চাষ হয়েছে। অন্যান্য ফসলের চেয়ে সূর্যমুখী চাষে বেশি লাভবান হবেন এমন প্রত্যাশা চাষীদেরও। সূর্যমুখী একধরনের একবর্ষী ফুলগাছ। সূর্যমুখী গাছ লম্বায়৩ থেকে ৪ ফুট পর্যন্ত হয়ে থাকে, ফুলের ব্যাস ১০ থেকে ১৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়। এই ফুল দেখতে কিছুটা সূর্যের মত এবং সূর্র্যের দিকে মুখ করে থাকে বলে এর এরূপ নামকরণ হয়েছে।এর বীজ হাঁস মুরগির খাদ্যরূপে ও তেলের উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই ফুলের বীজ থেকে যন্ত্রে মাড়াই করে তেল বের করা হয় ৷ তেলের উৎস হিসেবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সূর্যমুখীর ব্যাপক চাষ হয়। সমভুমি এলাকায় শীত ও বসন্তকালে, উঁচু লালমাটি এলাকায় বর্ষাকালে ও সমুদ্রকুলবর্তী এলাকায় শীতকালীন শস্য হিসাবে চাষ করা হয়।

জামালগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো আজিজল হক বলেন হাওরা লের অপেক্ষাকৃত উঁচু উর্বর জমিতে সূর্যমুখী চাষের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমান সরকারের প্রণোদনা কর্মসূচি ও রাজস্ব বাজেটের প্রদর্শনীর মাধ্যমে কৃষকদের বীজ সার ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আমরা উদ্বুদ্ধ করছি।

এ বছরই প্রথম এই জামালগঞ্জে সূর্যমুখী হাইসাল-৩৩ জাতের ফুল চাষ করার জন্য আমরা উদ্বুদ্ধ করেছি। কৃষকব্যাপক সাড়া দিয়েছে। এ ফুল চাষে বিঘা প্রতি কৃষক ১শ’দিনে ২৭ থেকে ৩০ হাজার টাকার বীজ পাবে। যার উৎপাদন খরচ ৫-৬ হাজার টাকা। অন্যদিকে এক বিঘা জমিতে ধান চাষ করলে ১৪০ দিনে কৃষক পায় ২০-২২ হাজার টাকা। যার উৎপাদন ব্যয় হয় ১৮-২০ হাজার টাকা। এছাড়া ধান চাষে শিলাবৃষ্টি, আগাম বন্যা, বাস্ট রোগের ঝুঁকি তো থাকছেই। তিনি আরো বলেন এ ফুল চাষে ধানের চেয়ে কম সময়ে বিনা ঝুঁকিতে ৪ থেকে ৬ গুণ আয় হবে কৃষকের।

তাছাড়া সূর্যমুখী ফুলের চাষ করলে ফুল থেকে তৈল,খৈল ও ব্যাপক জ্বালানী পাওয়া যায়। প্রতি কেজি বীজ থেকে কমপক্ষে আধা লিটার তৈল উৎপাদন সম্ভব। প্রতি বিঘা জমি হতে ৪ মণ থেকে ৬ মণ বীজ উৎপাদন সম্ভব বলে মনে করছে কৃষককুল। তৈল উৎপাদন হবে প্রতি বিঘা ১০০ লিটার থেকে ২৪০ লিটার পর্যন্ত। প্রতি লিটার তৈল বাজার মূল্য দুইশ থেকে আড়াইশ টাকা। তবে জামালগঞ্জে এখনও কৃষকরা পুরোপুরী এই ফুল চাষের সাথে পরিচিতি ও আগ্রহী হয়ে উঠেনি। কারণ এই উপজেলায় এর আগে সূর্যমুখী ফুলের চাষ হতে দেখা যায়নি।

একাধিক কৃষক ফজলুল হক ও খোকন মিয়ার সাথে আলাপ করে জানা যায়, উপজেলা কৃষি অফিস থেকে কৃষকদের সার, হাইব্রিড বীজ, নগদ টাকা ছাড়াও একদিনের প্রশিক্ষণ দিয়ে সূর্যমুখী ফুল চাষে উদ্বুদ্ধ করা হয়। যশোর জেলার আ লিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. হাফিজুর রহমানের দেওয়া তথ্যানুযায়ী জানা যায়, সূর্যমুখী ফুলের দ্বারা ক্যান্সার প্রতিষেধক, মহিলাদের বন্ধ্যাত্ব দূরীকরণ ঔষধ ছাড়াও ত্বকের সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে এ তেল বিশেষ উপকারী। উন্নত জাতের শতভাগ নিরাপদ সূর্যমুখীর এ জাতটি এখন থেকে কৃষক পর্যায়ে আবাদ করার জন্য সরকারিভাবে খুব গুরুত্ব সহকারে উৎসাহিত করা হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, খাটো জাতের এই সূর্যমুখী ফুলের তৈলে এন্টি অক্সিডেন্ট রয়েছে। এবং হৃদরোগের জন্য বিশেষ উপকারী। বর্তমান সময়ে দেশে যে ভোজ্য তেলের চাহিদা রয়েছে তার সিংগভাগই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। ঐসব তেল নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত নয়।

এসব দিক বিবেচনা করে কৃষিবিজ্ঞানীরা খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়াদি মাথায় রেখে মানুষের শরীরে রোগ প্রতিরোধী বিভিন্ন ফসল আবিস্কার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় খাটো জাতের সূর্যমুখীর গুণাগুণের পাশাপাশি বাংলাদেশের আবহাওয়ার সাথেও খুব উপযোগী। বিশ্বের দ্বিতীয় প্রধান তৈল বীজ ফসল হিসেবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সূর্যমুখীর ব্যাপক চাষ হচ্ছে। সুর্যমুখী বীজ থেকে উৎপাদিত তৈলে শতকরা ৪০-৪৫ ভাগ আমিষ থাকে। এতে শতকরা ৫৫-৭০ ভাগ নিলোলিক এসিড রয়েছে। যা রক্তের কলোস্টেরলের পরিমাণ কমায়। এ তেলে ক্ষতিকারক ইবুসিক এসিড নেই। বাংলাদেশে ১৯৭৫ সাল থেকে সূর্যমুখী ফুল একটি তৈলজাতীয় ফসল হিসেবে আবাদ হয়ে আসছে।

সূর্যমুখী ফুল চাষী উপজেলার রামপুর গ্রামের ফজলুল হক বলেন, কৃষি অফিসের পরামর্শ অনুযায়ী ১৩ বিঘা জমিতে সূর্যমুখী চাষ করেছি। ফলন বিক্রির পর যদি লাভজনক হয়, তাহলে আগামীতে আমিসহ আরও অনেকে সূর্যমুখী ফুল চাষে আগ্রহী হবে।

তিনি আরো বলেন আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আশা করি সূর্যমুখী চাষে ভালো ফলনসহ লাভবান হবে। সেই সাথে হাওর জনপদে এ ফসলটি ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হবে এবং কৃষক এতে বোরো ধানের চেয়ে অধিক লাভবান হবে। এব্যপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রিয়াঙ্কা পাল বলেন সরকার বীজ ও নগদ অর্থ প্রণোদনার মাধ্যমে এবারই প্রথম জামালগঞ্জে সূর্য মুখী ফুলের চাষ হয়েছে। আমাদের ডিসি মহোদয় সহ আমরা একাধিকবার পরিদর্শনে গিয়েছি। আমরা আশা করছি আশানুরূপ ফল পাবো।

Ads
Ads