বঙ্গবন্ধুর কাছে বাঙালির ঋণ শোধ হবার নয়

  • ৮-মার্চ-২০২০ ০৪:৪২ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর কাছে বাঙালির এ ঋণ কী কোনোদিন শেষ হবে? কোনোদিন শেষ হবার নয়। দিন যতোই সামনে ধাবমান হবে- জাতি ততোই বুঝতে পারবে বঙ্গবন্ধু আমাদের কি দিয়ে গেছেন! যে স্বাধীনতা তিনি দিয়ে গেছেন, তার কৃতজ্ঞতাস্বরূপ কি কোনো কাজ দিয়ে পূরণ করা সম্ভব এ জাতির? হ্যাঁ হতে পারে একটি কাজ। তিনি যে সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন নিয়ে দেশ স্বাধীন করেছিলেন; তার যে আদর্শ ছিল, তা ধারণ করাই এ জাতির মোক্ষম লক্ষ্য হওয়া উচিত। বিশ্বনেতা-রাষ্ট্রনায়ক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির জনকের স্বপ্ন বাস্তবায়নে নিরলস চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তাকে অনুসরণ করে আগুয়ান হওয়াটাই আমাদের কাজ হওয়া উচিত। অন্যদিকে বিভিন্নজন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বঙ্গবন্ধুকে নবতরভাবে উপস্থাপনা করছেন। তাদের কাজের আন্তরিকতাকে ধন্যবাদ জানাতে হয়। কারণ একটা সময় ছিল জাতির জনককে মুছে ফেলার হীনচেষ্টা চালিয়েছে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি। যার মধ্যে অন্যতম বিএনপি নামক দলটি। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ কোথাও প্রচারিত হলে বাঁধা সৃষ্টি করেছে। শুধু তাই নয়-রাষ্ট্রীয় প্রচারমাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ নিষিদ্ধ করা হয়। 

আজ নতুন প্রজন্ম বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনে বুঝতে পারছে- জাতির জনক সম্পর্কে এতদিন তাদের অন্ধকারে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। যাই হোক, জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা প্রর্দশন করে আসছে জয়বাংলা কনসার্ট। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের দিনে খুবই আন্তরিকতার সঙ্গে জয়বাংলা কনসার্টের আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। বিগতদিনে কয়েকটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় এর পক্ষ থেকে। স্মরণ করা যেতে পারে যে,  সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশনের (সিআরআই) প্রতিষ্ঠান ইয়াং বাংলার তত্ত্বাবধানে রাজধানীর আর্মি স্টেডিয়ামে চলে এই কনসার্ট। জাতির জনকের জন্মশতবার্ষিকীতে এবার কনসার্টে আনা হয়েছে ভিন্নমাত্রা। গত শনিবার ছিল ঐতিহাসিক ৭ মার্চ। এদিনে রাজধানীর আর্মি স্টেডিয়ামে জয়বাংলার কনসার্টে বিশ্বনেতা-রাষ্ট্রনায়ক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উপস্থিত ছিলেন। তার উপস্থিতিতে পুরো স্টেডিয়াম আলোকিত হয়ে ওঠে। উপস্থিত দর্শকরা ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ সাদা-কালোর পরিবর্তে রঙিন আলোকচিত্রের মাধ্যমে দেখার সুযোগ পান। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ ছাড়াও ধারাবিরণীতে উঠে এসেছে জাতির জনকের সুযোগ্যদুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার বক্তব্য। জাতির জনক কিভাবে গোটাবাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এলেন, তাদের বক্তব্যে রয়েছে এর মর্মস্পর্শি বক্তব্য। মোটকথা সাতই মার্চ যে ভাষণের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন, ৪৯ বছর পর সেই ভাষণের ত্রিমাত্রিক প্রদর্শনী যেন ফিরিয়ে আনল বাঙালির জাতীয় জীবনের অবিস্মরণীয় সেই বিকেল।

হলোগ্রাফিক প্রদর্শনীর মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণকে ফিরিয়ে আনা হয় হাজারো দর্শকের সামনে। কবি নির্মলেন্দু গুণের ‘স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো’ কবিতার শুরুর দিকের অংশের আদলে গ্রাফিক ভিডিও উপস্থাপনার মাধ্যমে শুরু হয় হলোগ্রাফি। এরপর ত্রিমাত্রিক উপস্থাপনায় দৃশ্যপটে হাজির হন বঙ্গবন্ধুর দুই মেয়ে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। ধারা বর্ণনায় সাতই মার্চের ভাষণের আগে পারিবারিক পরিসরে আলোচনার প্রেক্ষাপট স্বকণ্ঠে তুলে ধরেন বঙ্গবন্ধুর দুই মেয়ে। তাদের কথায় উঠে আসে, কীভাবে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব ভাষণে ‘মনের কথা’ বলতে বঙ্গবন্ধুকে উৎসাহিত করেছিলেন। দুই বোনের বর্ণনার শেষপ্রান্তে কবি নির্মলেন্দু গুণের কবিতার শেষের কিছু অংশ পাঠ করেন শেখ হাসিনা। আর একটি বিষয়। নির্বিশেষে সবাই এটা স্বীকার করেন যে, জাতির জনক আমাদের স্বাধীনতা এনে না দিলে বাংলাদেশের ভাগ্যে কখনোই স্বাধীনতা অর্জিত হতো কি-না তাও বলা কঠিন। তিনি জেল-জুলুম-অত্যাচার হজম করে বাংলার স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন। কিন্তু ঘাতকরা অত্যন্ত নির্দয়ভাবে সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছে। একাত্তরের পরাজিতশক্তি এবং দেশিয় বিশ্বাসঘাতকরা এই হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটিয়েছে। তার খেসারত আজও বাংলাদেশের মানুষকে দিতে হচ্ছে। জাতির জনক দেশ স্বাধীন করে দেশকে পূণর্গঠনে  গোটা দেশ চষে বেরিয়েছেন। স্বাধীনতার পরে দেশ ছিল বিধ্বস্ত, প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত। সেই ধ্বংসপ্রাপ্ত দেশটিকে তিনি তড়িৎ গতিতে স্বনির্ভর হিসেবে গড়ে তুলছিলেন। দেশকে স্বাধীন করে সোনার বাংলা গড়ার যে প্রত্যায় নিয়ে বঙ্গবন্ধু এগিয়ে যাচ্ছিলেন, সেখানে একটি ছেদ এনেদিল ঘাতকরা। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত কাজ করে যাচ্ছেন তার সুযোগ্যকন্যা বিশ্বনেতা-রাষ্ট্রনায়ক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার দক্ষরাষ্ট্র পরিচালনার মাধ্যমে ঘরে ঘরে এখন বিদ্যুৎ। দেশে একসময় কত গৃহহীন মানুষ ছিল, এখন আর একটিও গৃহহীন মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না। টানা ক্ষমতায় থেকে তিনি দেশকে অন্যন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। প্রতিটি ক্ষেত্রে নজিরবিহীন উন্নয়ন ঘটিয়ে বিশ্বদরবারে দেশের মর্যাদা বৃদ্ধি করেছেন। বর্বর পাকিস্থানের জান্তা সরকার বাংলাদেশকে চিরদিনের জন্য পরাধীন রাখতে চেয়েছিল। বাংলাকে শোষণ করে পাকিস্তান বলিয়ান হচ্ছিল। বাংলাদেশের পাটের টাকায় পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কোষাগার ফুঁলেফেঁপে উঠে। পাট বেচা টাকায় নতুন নতুন অস্ত্র-সস্ত্র বানাচ্ছিল পাকিস্তান জান্তা সরকার। 

অন্যদিকে আমাদের দেশের হাজার হাজার মানুষ না খেয়ে মারা গেছে। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের শোষণ-শাসন আর জুলুম-অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। দীর্ঘ কারাজীবন ভোগ করেন। কিন্তু পাকিস্তানের কাছে কোনোভাবেই মাথানত করেননি। প্রধানমন্ত্রীর লোভ তাকে পরাস্ত করতে পারেনি। তিনি প্রধানমন্ত্রীত্ব চাননি, তিনি চেয়েছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা। সেই স্বাধীনতা তিনি এনে দিয়েছেন। ৭ মার্চের ভাষণে তিনি স্বাধীনতার ডাক দেন। তার ডাক পৌঁছে যায় বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে এবং আন্তর্জাতিক পরিম-লে। জাতির জনককে নিয়ে জয়বাংলা কনসার্ট যে গুরুদায়িত্ব পালন করেছে, তা এক কথায় জাতির সামনে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণকে নতুন উপস্থাপনার রীতিতে তুলে ধরা হয়েছে। এতে যে এ সময়ের নতুন প্রজন্মের ছেলে-মেয়েসহ সবাইকে উদ্দীপ্ত করে তুলেছে, তা, বলাই বাহুল্য। 

পরিশেষে বলা যায়, জয়বাংলা কনসার্ট জাতীয় একটি দায়িত্ব পালন করেছে। তাদের অভিনন্দন জানিয়ে ছোট করার কোনোই অর্থ হয়না। তারা জাতির জনককে নিয়ে যে অভিননন্দনযোগ্য কাজ করেছে, তা জাতি চিরদিন মনে রাখবে। আগামীতে আশা করা যায়, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আরো বৃহৎপরিসরে কাজ করবে। সেই কাজ দেখে দেশের আত্মহারা হবেন। স্বাধীনতা নিয়ে এদেশের একশ্রেণির মানুষ ধোঁয়াশা সৃষ্টির পায়তারা করেছে বহুকাল। জিয়াকে জাতির জনকের সমকক্ষ করে তোলার চেষ্টা আমরা চোখের সামনে দেখেছি। স্বাধীনতা বিরোধী ঘাতকরাই যে এ কাজ পরিকল্পিতভাবে করেছে, তাও সবার জানা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা হালে পানি পায়নি। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাংলাদেশের স্থপতি-জাতির  জনক বঙ্গবন্ধু তার অমরকীর্তি নিয়ে ঠিকই বাঙালি মানসে জেগে উঠেছে নবতরওভাবে।   

Ads
Ads