করোনা মোকাবিলায় সম্মিলিত প্রচেষ্টার বিকল্প নেই

  • ১৩-মার্চ-২০২০ ০৪:৩৮ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান :: 

করোনাভাইরাসে গোটা বিশ্বই থরথর করে কাঁপছে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন দেশে এ ভাইরাসে বহু মানুষ মারা গেছে। মৃতের সংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজার। একসঙ্গে এত বিপুলসংখ্যক মানুষ মারা যাওয়ায় সর্বত্র আতঙ্ক বিরাজ করছে। বাংলাদেশেও তিন ব্যক্তি করোনায় আক্রান্ত হয়েছে। তবে দুজন সুস্থ হয়ে উঠেছেন। এতে কিছুটা মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। তারপরেও দেশের মানুষের মন থেকে করোনার আতঙ্ক উঠে যায়নি। বরং অজানা সব আতঙ্ক বিরাজ করছে। উদ্ভূত এই পরিস্থিতিতে অতিমাত্রায় বিচলিত না হয়ে আমাদেরকে সাহসের সঙ্গে ভয়াবহ এই ভাইরাস মোকাবিলা করতে হবে। 

করোনাভাইরাস থেকে দেশের মানুষকে সুরক্ষা দিতে সরকার সর্বাত্বক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য সরকার সারা দেশে এক হাজার ৩৫০টি আইসোলেশন শয্যা প্রস্তুত রেখেছে। রাজধানী ঢাকাসহ পাঁচটি বিভাগের বিভিন্ন জেলায় এই শয্যা চালু করা হয়েছে। গত রোববার দেশে প্রথমবারের মতো তিনজন করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীর সন্ধান মেলে বলে সরকারিভাবে জানানো হয়। ওই তিনজনকে রাজধানীর একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসায় দুইজন সুস্থ হয়ে উঠেন।

সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক জানান, যে কোনো সময় তাদের হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হবে। তাদের সংস্পর্শে আসা কোয়ারেন্টাইনে থাকা সন্দেহভাজনরাও ভালো আছেন। এরই মধ্যে গতকাল একজনকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। তিনি নির্বিঘেœ বাড়ি চলে গেছেন। 

করোনা আক্রান্ত তিন ব্যক্তি শনাক্ত হওয়ার পর দেশজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার নানামুখী পদক্ষেপ নেয়। কয়েকটি জেলায় প্রায় সাড়ে তিনশ ব্যক্তিকে হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়। একই সঙ্গে আইসোলেশন শয্যা প্রস্তুত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। এ পর্যন্ত রাজধানীর ছয় হাসপাতালে ৪০০, চট্টগ্রাম মহানগরীর ২ হাসপাতালে ১৫০, সিলেট মহানগরীর ২ হাসপাতালে ২০০, বরিশাল মহানগরীর ২ হাসপাতালে ৪০০ এবং রংপুর মহানগরীর ২ হাসপাতালে ২০০ আইসোলেশন শয্যা প্রস্তুত করা হয়েছে। সরকারের এ উদ্যোগে দেশের মানুষকে যথাযথ সুরক্ষা দেবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। এদিকে গতকাল ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ঘোষণা মোতাবেক এই প্রাণঘাতি ভাইরাস থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য দেশের সব মসজিদে জুমার নামাজের পর বিশেষ মোনাজাত করা হয়েছে। যা মানুষের মনে অনেকটাই বিশ্বাসের ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছে। গোটা বিশ্ব করোনায় যেভাবে প্রকম্পিত হয়ে পড়েছে, তাতে মানুষ নিজেকে বড়ই অনিরাপদ বিপদাপন্ন মনে করছে। সাধারণ মানুষ থেকে উচুতলার মানুষের মধ্যে করোনার আতঙ্ক সমান ভাবে বিরাজ করছে। করোনা থেকে সুরক্ষা দিতে শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে কিছু নিয়ম প্রবর্তন করা হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী দিপু মণি শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান বন্ধ না রাখার কথা বলেছেন যা গণমাধ্যমগুলোতে এসেছে। 

গণমাধ্যম আরো জানিয়েছে, দেশে করোনাভাইরাস (কভিড-১৯) শনাক্ত হওয়ায় স্কুল-কলেজের পাঠদানের বাইরে সব ধরনের অনুষ্ঠান স্থগিতের নির্দেশ দিয়েছে সরকার। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বার্ষিক পিকনিক, শিক্ষা সফর, বার্ষিক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ অন্য যে কোনো অনুষ্ঠানের আয়োজন থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। গত বুধবার মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) পক্ষ থেকে জারি করা এ নির্দেশনায় স্কুল-কলেজের প্রাত্যহিক জাতীয় সংগীত পরিবেশনা ও সমাবেশ (অ্যাসেমব্লি) শ্রেণিকক্ষেই আয়োজন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অবশ্য শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা চাইছেন শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা। অনেক অভিভাবক তাদের ছেলে-মেয়েকে শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে অনিচ্ছুক। তবে পাঠদান যাতে বিঘিœত না হয় সরকার সেদিকে সজাগ বলেই নতুন এই নিয়ম বেঁধে দিয়েছে। আমরা মনে করি নতুন এই নিয়মে শিক্ষার্থীরা উপকৃত হবেন। সরকার বিবেচনায় প্রকৃত অবস্থার প্রেক্ষিতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ সংশ্লিষ্ট মহলের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। করোনার কারণে বাংলাদেশ বিমানের আয়ে ধস নেমেছে। যাত্রী পরিবহন কমে যাওয়ায় এই অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। 

গণমাধ্যমগুলো এ ব্যাপারে জানিয়েছে, বিভিন্ন দেশ ভিসা স্থগিত করায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসসহ বাংলাদেশের বেসরকারি বিভিন্ন এয়ারলাইনসগুলোর ব্যবসায়িক কার্যক্রম অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে বিদেশি এয়ারলাইনসগুলোও বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম অনেকটাই গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। খরচ কমাতে বিমান ওভারটাইম বন্ধ করেছে। বিমান চলাচল স্থবির হয়ে পড়ায় সিভিল এভিয়েশন অথরিটির আয় কমার যে আশঙ্কা করা হয়েছিল পরিস্থিতি সেদিকেই গড়াচ্ছে। এসব রেগুলেটরি ও বাণিজ্যিক সংস্থার আয় কমে যাওয়ায় বছর শেষে সরকারের রাজস্বে ঘাটতি দেখা দেওয়া স্বাভাবিক। এতে অর্থনীতির উপর চাপ বাড়বে বলে অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা। বিমান চলাচল সেক্টরটি মারাত্মক সংকটের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার কারণে এই খাতটি লোকসান গুণতে বাধ্য হচ্ছে। একের পর এক রুট বন্ধ হওয়ায় তা এখন সরকারের জন্য দুশ্চিন্তার কারণ। এই অবস্থায় খাতটিকে টিকিয়ে রাখার জন্য নতুন নতুন ভাবনার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে আমরা মনে করি।  নতুন সুযোগ সৃষ্টি করা না গেলে বিমান সেক্টরে নিয়োজিত কর্মীরা বেকার হয়ে পড়বেন যা কোনভাবেই কাম্য নয়।

বৈশ্বিক এই ভাইরাসটির প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশিদের ভারতে যাওয়ার ব্যাপারেও। গত বৃহস্পতিবার থেকে বাংলাদেশিদের নতুন করে ভিসা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে এদিন  নতুন করে বাংলাদেশিদের ভিসা না দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশন থেকে এক প্রজ্ঞাপণ জারি করা হয়েছে।  

আমাদের দেশে যেকোন দুর্যোগে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার কোন নজির নেই। সবসময়ই বিরোধীতা আমাদের মজ্জাগত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। জাতির এই দুর্যোগের সময়ে সে অভ্যাস আমরা পরিত্যাগ করতে পারিনি। যখন মানুষ আতঙ্কিত তখনো অনেকেই বিষয়টি নিয়ে নোংরা রাজনীতি করছেন। যখন সমবেতভাবে এই বিপর্যয় কাটিয়ে উঠার প্রয়োজন তখনো সেই নোংরা খেলা একই রকম ভাবে চলছে। যা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।  

আমরা মনে করি করোনা কোন বিশেষ দেশ বা জাতির জন্য হুমকি নয়। এটি এখন বিশে^র সবচেয়ে বড় সমস্যা আর সব দেশের সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। পরিস্থিতি যে দিকে মোড় নিচ্ছে তাতে মনে হয় না খুব দ্রুত এই অবস্থার অবসান ঘটবে। করোনা থেকে দেশের মানুষকে সুরক্ষা দিতে একদিকে দেশের সরকার যেমন প্রাণান্তর চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে, পাশাপাশি দেশের মানুষকে করোনার ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ মেনে চলতে হবে। মনে রাখতে হবে সুরক্ষায় নিজের প্রচেষ্টাই সর্বোত্তম। জনগণ সে বিষয়ে সজাগ থাকবে এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশাবলী পালন করে করোনাভাইরাস মুক্ত বাংলাদেশ গড়ায় ভূমিকা রাখবে বলে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।

Ads
Ads