করোনা মোকাবিলায় সঠিক পথেই বাংলাদেশ

  • ১৪-মার্চ-২০২০ ০৪:৪৫ অপরাহ্ন
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

সার্কভুক্তদেশগুলো একজোট হয়ে করোনাভাইরাস মোকাবিলার আহ্বান জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তার এই আহ্বানে বাংলাদেশসহ সার্কভুক্ত দেশগুলোর সরকারপ্রধানগণ সাড়া দিয়েছেন। নরেন্দ্র মোদির এই আহ্বানকে আমরা সাধুবাদ জানাই। কারণ, করোনা এখন আর কোনো দেশের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। যদিও করোনা চীনে প্রথম হানা দেয়। এরপর তা সারা বিশ্বের সব মহাদেশেই ছড়িয়ে পড়ে। তাই বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ভাইরাসটিকে বিশ্ব মহামারী হিসেবে ঘোষণা করে। বৈশ্বিক সমস্যা যা মানব ইতিহাসের চরম বিপর্যয়। ফলে সার্কভুক্ত দেশগুলো একাট্টা হয়ে এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামবে যার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। সমবেত এই লড়াই এ অঞ্চলের মানুষকে আরো অধিক সুরক্ষা দেবে বলে আমাদের বিশ্বাস। গত শুক্রবার করোনাভাইরাসের সর্বগ্রাসী রূপ দেখে সার্ক সদস্যদেশের নেতাদের একজোট হয়ে এর মোকাবিলার সুপারিশ করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। একাধিক টুইটে এই প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেছেন, করোনা মোকাবিলায় সার্ক সদস্যদেশের নেতারা উপযুক্ত কৌশল তৈরি করার এখনই সময়। কীভাবে সেই কৌশল বা উপায়ের খোঁজ পাওয়া যেতে পারে, এ ব্যাপারে তারও মতামত একই টুইটে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, নিজের দেশের নাগরিকদের কীভাবে সুরক্ষিত রাখা যায়, ‘আমরা সবাই তা ভিডিও কনফারেন্সিং মারফত আলোচনা করতে পারি। ‘সবাই মিলে একজোট হয়ে পৃথিবীকে সুস্থ ও নীরোগ রাখার প্রচেষ্টায় আমরা বিশ্বে একটা নজির সৃষ্টি করতে পারি।’

ভারতের প্রধানমন্ত্রীর এমন মহৎ উদ্যোগ সত্যিকার অর্থেই অর্থবহ হয়ে উঠবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। বর্তমানে করোনাভাইরাসের মোকাবিলায় এই মুহূর্তে গোটাবিশ্বে থরহরিকম্প শুরু হয়েছে। একের পর এক দেশের নাগরিকরা এই মরণরোগে আক্রান্ত হচ্ছে। পরিস্থিতির মোকাবিলায় চরম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বিশ্ব অর্থনীতি। জনজীবনে সৃষ্টি হয়েছে আতঙ্ক। ইতিমধ্যে বিশ্বের অনেক দেশ করোনাভাইরাসের  প্রতিরোধে নিজেদের মত করে পরিকল্পনা তৈরি করেছে।  বেশ কয়েকটি দেশ জরুরি অবস্থা জারি করতে বাধ্য হয়েছে। সে সব দেশে করোনার ভয়ে রাস্তাঘাট এখন অনেকটাই জনশূন্য। একান্ত প্রয়োজন ছাড়া কেউ বাসাবাড়ি থেকে বের হচ্ছেন না। রাস্তাঘাটে শুনশান নীরবতা নেমে এসেছে। বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী দেশ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, করোনার কারণে জাতীয় জরুরি অবস্থা জারি করেছেন। একই পথে হেটেছে স্পেন।  স্থানীয় সময় শুক্রবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সামনে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঘোষণা দেন ট্রাম্প। সিএনএন অনলাইনের এক প্রতিবেদন  থেকে এই তথ্য মিলেছে।  এ ছাড়াও মার্কিন প্রেসিডেন্ট করোনা ঠেকাতে ৫০ বিলিয়ন ডলার সাহায্য তহবিল ঘোষণা করেন। যুক্তরাষ্ট্রে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৭০১ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেছে। দেশটিতে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ৪০ জনের অধিক।

এমনই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকার করোনা মোকাবিলায় যথাযথ উদ্যোগ নিয়েছে। তবে অনেক বিশেষজ্ঞ বলেছেন, করোনা মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা যাতে যথাযথভাবে পালিত হয়, তার দিকে কঠোর নজরদারির প্রয়োজন রয়েছে। সামান্য উদাসীনতা ও গাফলতিতে দেশের মানুষের অনেক বড় ক্ষতির সম্ভাবনা যা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ফলে কোনো ধরনের গাফলতি যাতে না হয় তার প্রতি কঠোর নজরদারী নিশ্চিত করতে হবে। দেশের মানুষের গভীর আস্থা রয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি। তিনি এই কঠিন মুহূর্তে দেশের মানুষকে করোনা থেকে সুরক্ষা দিতে সংশ্লিষ্টদের কোনো গাফলতি সহ্য করবেন না বলে আমরা বিশ্বাস করি। গণমাধ্যমের খবরে জানা যায়, করোনায় বিপর্যস্ত ইতালি থেকে দেশে ফেরত আসা বাংলাদেশিরা সুস্থ আছেন। তবে দেশে ঝুঁকি এড়াতে তাদের কোয়ারেন্টিনে রেখে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হচ্ছে। বাংলাদেশে এর আগে যে তিনজনের দেহে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঘটেছিল, তারাও সুস্থ হয়ে উঠেছেন বলে জানিয়েছে গণমাধ্যমগুলো। গতকাল শনিবার সকালে এমিরেটসের একটি ফ্লাইটে ঢাকার হজরত শাহজালাল বিমানবন্দরে সকালে নামেন ইতালির রোমে থেকে আসা ১৪২ বাংলাদেশি। তাদের বিমানবন্দর সংলগ্ন আশকোনা হজ ক্যাম্পে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। এদিকে করোনাভাইরাসকে বৈশ্বিক মহামারী হিসেবে ঘোষণার পর রোগটি প্রতিরোধে আরও বেশি উদ্যোগী হয়েছে বাংলাদেশ। রোগটি যাতে আর ছড়াতে না পারে, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে। বিশেষ করে দুটি বিষয়ে কোনো ধরনের ছাড় না দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রথমমত, বিদেশফেরত যাত্রীদের জন্য হোম কোয়ারেন্টাইন । দ্বিতীয়ত, উপসর্গ থাকতে পারে এমন সন্দেহজনকদের জন্য আইসোলেশন ব্যবস্থা। এ দুটি বিষয়কে সরকার আইনগত বৈধতা দিয়েছে। এমনকি রোগটি প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সরবরাহ ও কেনাকাটায় নিয়ম শিথিল করা যা রোগ নিয়ন্ত্রণে অনেকটাই ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

অবশ্য দেশের জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা করোনাভাইরাসের মহামারী ঘোষণাকে আক্রান্ত ও আক্রান্ত নয় সব দেশের জন্য সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি বলে মনে করছেন। তারা বলেছেন, এখন সব দেশকেই ভাইরাসটি প্রতিরোধে সমান ব্যবস্থা নিতে হবে। এককভাবে নয়, সংকটের সমাধান করতে হবে সমন্বিতভাবে, সব দেশ মিলে। বিশেষ করে এমন মহামারী ঘোষণা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য অবশ্যই ‘সংকটপূর্ণ’ বলে মনে করছেন এসব বিশেষজ্ঞরা। তারা মহামারী ঠেকাতে সরকারের নেওয়া উদ্যোগগুলোর বাস্তবায়নের আগের চেয়ে আরও বেশি কঠোর ও সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। তারা মনে করছেন, মহামারী ঘোষণার মধ্যেই রোগটি সামাল দিতে না পারলে পরে বাংলাদেশ সংকটে পড়বে। কারণ এ সময় পৃথিবীর সব দেশের ও দাতা সংস্থার শিথিল নিয়মের মধ্যে সহযোগিতা পাওয়া যাবে। অবশ্য মহামারী ঠেকাতে বাংলাদেশ সঠিক পথেই এগোচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন দেশের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা। গণমাধ্যমকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, ‘সরকার সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। এমনকি আমরা কিছু কিছু বিষয়কে আইনগত বৈধতা দিয়েছি, যাতে সরকারের নেওয়া কোনো উদ্যোগ কেউ অবহেলা বা অবজ্ঞা করতে না পারে।’ সরকারের গৃহিত পদক্ষেপ প্রমাণ করে সঠিক পথেই রয়েছে বাংলাদেশ। 

পরিশেষে আমরা বলতে চাই, করোনার কারণে গোটাবিশ্ব আজ কঠিন সংকটের মুখোমুখি। সমন্বিত উদ্যোগেই এ অবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। করোনা রোধে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রস্তাব সময়োচিত বলে আমরা বিশ্বাস করি। করোনা আজ বৈশ্বিক একটি প্রাণিঘাতি ভাইরাস। মনে রাখা দরকার নগরে আগুন লাগলে দেবালয় এড়ায় না। তাই বৈশ্বিক এই ভাইরাস মোকাবিলায় সার্কভুক্ত দেশগুলো একজোট হয়ে কাজ করবে বলেই আমাদের প্রত্যাশা। সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এই প্রাণঘাতি ভাইরাস মোকাবিলার সহজ পথ বেরিয়ে আসবে বলে আমাদের বিশ্বাস। 

Ads
Ads