ফেসবুকে বন্ধুত্ব অতঃপর যা ঘটল

  • ২৯-Aug-২০১৮ ০৬:০০ অপরাহ্ন
Ads

ফেসবুক বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে খন্দকার রবিউল আউয়াল নামের এক যুবক অপহৃত হয়। গাজীপুরে একটি বাসায় আটকে রেখে টানা তিনদিন তাকে নির্যাতন চালায় ফেসবুকের কথিত ওই বন্ধু ও তার সহযোগীরা। আদায় করে মুক্তিপণ।

অবশেষে গোয়েন্দা পুলিশের অভিযানে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় ভুক্তভোগী ওই যুবককে। একই সঙ্গে অপহরণকারী চক্রের তিন সদস্যকেও গ্রেফতার করা হয়।

গত ২৬ আগস্ট দুপুর ১টার দিকে ফেসবুক বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে রবিউল (২৫) নামের ওই যুবক অপহৃত হয়। রাজধানীর মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে অপেক্ষারত ওই যুবককে তার ফেসবুক বন্ধুসহ অজ্ঞাত ৪ থেকে ৫ জন লোক জোর করে একটি ট্যাক্সি ক্যাবে তুলে নিয়ে যায়। আটকে রেখে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালিয়ে তার পরিবারের কাছে ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে অপহরণকারী চক্রের সদস্যরা।

এরপর ২৮ আগস্ট সন্ধ্যায় গাজীপুরের জয়দেবপুরের চান্দনা চৌরাস্তার দিঘীর চালা এলাকার একটি বাড়ি থেকে অপহৃত যুবককে উদ্ধার এবং অপহরণকারী চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেফতার করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা (পূর্ব) বিভাগের একটি টিম।

গ্রেফতারকৃতরা হলো, মওমর ফারুক (২০), শরীফ (১৯) ও লিমন হোসেন (২৫)। চক্রের আরও কয়েকজন সদস্য পলাতক রয়েছে। এই ঘটনায় ভুক্তভোগীর পরিবারের পক্ষ থেকে রাজধানীর মতিঝিল থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। ভুক্তভোগী রবিউল টাঙ্গাইলের ভুয়াপুর ঘাটান্দী এলাকার খন্দকার আব্দুল রহিমের ছেলে।

গোয়েন্দা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, অপহরণকারীরা বিকাশ নম্বর থেকে তাদের অন্য এক সদস্যকে টাকা পাঠিয়েছিল। সেই সূত্র ধরে চক্রের সদস্যদের অবস্থান নিশ্চিত করা হয়। একপর্যায় গাজীপুরের চৌরাস্তার চান্দনার একটি বাড়ি থেকে চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেফতার ও ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করা হয়। চক্রটি ফেসবুকের মাধ্যমে বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে প্রথমে বন্ধুত্ব গড়ে তোলে।

এরপর দেখা করার কথা বলে কৌশলে অপহরণ করে আটকে মুক্তিপণ আদায় করে। তারা বিভিন্ন ব্যবসার প্রলোভন দেখায় ও অনেক সময় নারী সদস্যদের দিয়ে প্রেমের ফাঁদে ফেলে ডেকে আনে অথবা ঘুরতে যাওয়ার কথা বলে কৌশলে অপহরণ করে আটকে রাখে। এই চক্রের কয়েকটি আস্তানার সন্ধান পেয়েছে পুলিশ। অপহরণের পর তারা ভুক্তভোগীদের গাজীপুর, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জে তাদের আস্তানায় রাখে।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃতরা জানায়, অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের এই চক্রের মূলহোতা মিজান (৩৭)। তার জয়দেবপুরের চৌরাস্তায় ময়মনসিংহ রোডে নোভা ইলেকট্রনিক নামে একটি শোরুম রয়েছে। তার নির্দেশেই দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন লোকদের অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করে চক্রের সদস্যরা। তাদের আরও সহযোগী আছে। এদের মধ্যে রফিক (২৪), জনি, লোটাস, মুকুল, রহিম, আশরাফ, রাসেল, আলী ও সানী উল্লেখযোগ্য। চক্রের সদস্যরা পেশাদার অপহরণকারী।

গোয়েন্দা ও অপরাধ তথ্য (পূর্ব) বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) বশির উদ্দিন বলেন, ‘গ্রেফতারকৃতরা পেশাদার অপহরণকারী চক্রের সদস্য। তারা দীর্ঘদিন যাবত বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে অনেককে অপহরণ করেছে। আমরা তিনজনকে গ্রেফতার করেছি। তাদের আরও সদস্য পলাতক রয়েছে। তাদেরও গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।’

তিনি বলেন, ‘অপহরণকারীরা মুক্তিপণ চেয়ে ভুক্তভোগীর পরিবারকে যে বিকাশ নম্বর দিয়েছিল, সেগুলো ভুয়া রেজিস্ট্রেশন করা নম্বর ছিল। শুধুমাত্র মুক্তিপণের টাকা নেওয়ার জন্যই চক্রের সদস্যরা এই বিকাশ নম্বরগুলো ব্যবহার করতো। কাজ হয়ে গেলে সেটি সঙ্গে সঙ্গে ফেলে দিত।

ভুক্তভোগী খন্দকার রবিউল আউয়াল কে জানান, মতিঝিল থেকে আমাকে জোর করে একটি গাড়িতে তুলে নিয়ে যায় গাজীপুরের একটি বাসায়। সেখানে নিয়ে ১০ থেকে ১২ জন মিলে আমাকে অনেক মারধর করে। নানাভাবে নির্যাতন চালায় ওরা। পরে আমার পরিবারের কাছে ফোন করে টাকা দাবি করে।

নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে তিনি জানান, ‘গায়ে সিরিঞ্জ ফুটিয়ে রক্ত বের করা হতো, সেগুলো মাটিতে ফেলে আবার সিরিঞ্জ ফুটিয়ে রক্ত বের করতো। এরপর হাত-পায়ের তালুতে সুই ফুটিয়ে খোঁচানো হয়। চিৎকার করলেই প্লাস দিয়ে হাতের নখ টানতো। কিছুক্ষণ পরপর চড় থাপ্পর আর ঘুঁষি মারতো।

তিনি বলেন, ‘গত ২৬ আগস্ট ব্যক্তিগত কাজের জন্য ঢাকার মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে যাই। কাজ শেষে আমার ফেসবুক বন্ধু জনিটপের সঙ্গে মেসেঞ্জারে কথা হয়। পরে ফোনে আমাকে ব্যাংকের সামনে থাকতে বলে। দুপুর ১টার দিকে অজ্ঞাত ৪ থেকে ৫ জন লোক আমাকে একটি ট্যাক্সি ক্যাবে উঠিয়ে নিয়ে যায়। অজ্ঞাত স্থানে একটি কক্ষের ভেতর আটকে রাখে এবং ১০ থেকে ১২ জন মিলে আমাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করে। এরপর আমার সঙ্গে থাকা নগদ ৭ হাজার টাকা ও ব্যবহৃত দুটি মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়। একপর্যায়ে আমার কাছে ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। টাকা না দিলে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। পরে আমার বাবার কাছে মোবাইল ফোনে মুক্তিপণ চায়।’

ভুক্তভোগী রবিউলের ভাই টাঙ্গাইল ভুয়াপুর পৌরসভার কাউন্সিলর খন্দকার জাহিদ হোসেন বলেন, অপহরণকরীরা রবিউলকে অনেক মারধর করেছে। শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালিয়েছে। বর্তমানে রবিউল মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে। অপহরণকারীরা রবিউলকে আটকে রেখে ৫ লাখ টাকা মুক্তপণ দাবি করে। এরপর কয়েকটি বিকাশ নম্বর দেয় সেখানে দুই দফায় মোট ১০ হাজার টাকা পাঠিয়েছি। ওরা বলেছিল, মুক্তিপণের টাকা না দিলে রবিউলকে মেরে ফেলবে। সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন

/ই

Ads
Ads