বাংলাদেশ ব্যাংকের বইয়ে বঙ্গবন্ধুকে অবমূল্যায়ন, দায় এড়াতে পারে না গর্ভনর

  • ১৫-Sep-২০১৮ ০৬:০০ অপরাহ্ন
Ads

:: নিজস্ব প্রতিবেদক ::

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রকাশিত “বাংলাদেশ ব্যাংকের ইতিহাস” নামক বইয়ের কোথাও স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি স্থান পায়নি। অথচ বইটিতে পাকিস্তানের সামরিক শাসক আইয়ুব খান এবং পূর্ব পাকিস্তানের গর্ভনর মোনায়েম খানের মোট চারটি ছবি ছাপা হয়েছে।

মোট ৩৪৩ পৃষ্টার বইয়ে বঙ্গবন্ধুর কন্যা ও তিন বারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি ছবি থাকলেও তা বেশ অস্পষ্ট এবং ছোট। তবে ব্যাপক সমালোচনার মুখে বইটি বিতরণ এরই মধ্যে বন্ধ রাখা হয়েছে। আর তা সংশোধন ও সংযোজন করতে বাংলাদেশের ব্যাংকের ডেপুটি গর্ভনর এসএম মনিরুজ্জামানকে প্রধান করে ৫ সদস্যবিশিষ্ট একটি রিভিউ কমিটি গঠন করা হয়েছে। 

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বইটির প্রকাশক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সহাকারী মুখপাত্র জিএম আবুল কালাম আজাদ।

তবে, এক সময়ের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত এস এম মনিরুজ্জামানকে রিভিউ কমিটির প্রধান করায় প্রশ্ন উঠেছে খোদ বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেই।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের জিএম ও সহাকারী মুখপাত্র এবং বইটির প্রকাশক জিএম আবুল কালাম আজাদ বলেন, “বইটিতে বঙ্গবন্ধুর অবদান ধারাবাহিকভাবে বর্ণনা করা আছে। এই বইটি প্রণয়নের সিদ্ধান্ত হয়েছিল সাবেক গর্ভনর ড. আতিউর রহমানের আমলে। গত কয়েক মাস আগেই বইটি প্রকাশের পর কিছু ব্যতয় ধরা পড়ায় গর্ভনর ফজলে কবির বইটির বিতরণ বন্ধ রাখেন।”

তিনি বলেন, বইটিতে ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় চলে আসা কিছু অপ্রাসঙ্গিক বিষয় বাদ দেয়ার পাশাপাশি প্রতিটি অনুচ্ছেদ যাচাই বাছাই করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গর্ভনর এসএম মনিররুজ্জামানকে প্রধান করে পাচঁ সদস্য বিশিষ্ট একটি রিভিউ কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি  এরই মধ্যে একটি বৈঠক করেছে। বৈঠকে বেশ কিছু বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে সেগুলো বাস্তবায়ন করেই বইটি আবারও প্রকাশ করা হবে।

এসব সিদ্ধান্তের মধ্যে রয়েছে- বাংলাদেশে ব্যাংকের ইতিহাস বইটিতে বঙ্গবন্ধুর অবদানের পাশাপাশি তার বিভিন্ন ছবি এবং বাংলাদেশ ব্যাংকে নির্মিত বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নিয়ে একটি প্রতিবেদন সংযোজন করা, জানান এই মুখপাত্র।

জিএম আবুল কালাম আজাদ আরও বলেন, বাংলাদেশের বিভিন্ন মুদ্রায় বঙ্গবন্ধুর যে সব ছবি রয়েছে সেগুলো বইটিতে স্থান দেয়ারও সিদ্ধান্ত হয়েছে। একইসঙ্গে বইটির অপ্রাসাঙ্গিক ছবি বাদ দিয়ে প্রতিটি অনুচ্ছেদ পুনরায় সম্পাদিত হবে।

তিনি বলেন, যে সব বিষয় এখানে চলে এসেছে সেটা ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় চলে আসছে। তবে স্বাধীনতার সংগ্রামের কথা বিবেচনায় আনলে এগুলো না আসলেও চলত।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, “বাংলাদেশ ব্যাংকের ইতিহাস”নামের এই বইটি দুইটি পর্বে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম পর্বে (১-৩৪২) পৃষ্ঠায় রাখা হয়েছে, বিভিন্ন প্রবন্ধ, নিবন্ধ, স্মুতিচারণা ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের ইতিহাস সংক্রান্ত বিষয়। বইটির দ্বিতীয় পর্ব (৩৪৩-৩৬১) রাখা হয়েছে ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাকালীন ইতিহাস ঐতিহ্য এবং বিভিন্ন সময়ে সভা, সেমিনার, টেনিং প্রোগ্রাম এবং উন্নয়নমূলক কাজের উদ্ভোধন সংক্রান্ত বিভিন্ন ছবি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিষ্ঠার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকলেও এত বড় এই বইটিতে জাতির জনক হিসেবেও তার কোন ছবির ঠাঁই হয়নি। অথচ দুই পর্বের বইটিতে আইয়ুব খানের তিনটি এবং মোনায়েম খানের একটি গ্রুপ ছবি বেশ গুরুত্বের সাথেই তুলে ধরা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসে বইটির প্রকাশনার সময় উল্লেখ করা হলেও বইটি ছাপা হয়েছে তারও অনেক পড়ে। মূল বইয়ের ৩৪৩ পৃষ্ঠায় আইযুব খানের দুইটি ছবি ছাপা হয়েছে। প্রথম ছবিটির নীচে ক্যাপশন দেয়া হয়েছে, “স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের ঢাকার মতিঝিলস্থ প্রধান ভবনের পরিদর্শন বহিতে স্বাক্ষর করেছেন পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ আইয়ুব খান (১০ ডিসেম্ভব ১৯৬৮)।” ছবিটিতে দেখা যায় আইয়ুব খান বসে স্বাক্ষর করছেন, আর তার পিছনে সামরিক বেসামরিক কর্মকর্তারা দাড়িয়ে আছেন।

একই পৃষ্ঠায় দাঁড়ানো অবস্থায় আইয়ুব খানের আরেকটি ছবি রয়েছে। যেখানে ছবিতে আইয়ুব খানের পিছনে কয়েকজন বেসামরিক লোক দাঁড়িয়ে আছেন। এই ছবির ক্যাপশনে লেখা হয়েছে “ পাকিস্তানের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ আইয়ুব খান ও স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তান, ঢাকার প্রধান ভবনের  কর্মকর্তারা (সন ১৯৬৮)।

এছাড়া বইটির ৮২তম পৃষ্ঠায় আইয়ুব খানের ব্যাংক উদ্ভোধনের আরেকটি ছবি রয়েছে। ছবিতে দেখানো হয়েছে, আইয়ুব খান চাবি দিয়ে তালা খুলছেন। ছবির নীচে ক্যাপশন লেখা হয়েছে, “পাকিস্তনের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ আইয়ুব খান ১০ ডিসেম্ভর ১৯৬৮ তারিখে স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তান, ঢাকার নতুন ভবন উদ্ভোধন করেন।”

এছাড়াও বইটির ৮৩ পৃষ্ঠায় স্থান পেয়েছে পূর্ব পাকিস্তানের সাবেক গর্ভনর মোনায়েম খান টুপি পরিহিত অবস্থায় মঞ্চে বসে আসেন এমন একটি ছবি। এই ছবির ক্যাপশনে লিখা হয়েছে- “স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের ডিজি অফিস ভবনের (বর্তমান বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্য্যলয়ের প্রধান ভবন) উদ্ভোধন অনুষ্ঠান (১০.১২.১৯৬৮)” প্রত্যেকটি ছবি আর্ট পেপারে মুদ্রিত।

অন্যদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের ইতিহাস বইয়ে ৮৪তম পৃষ্ঠায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অস্পষ্ট ও অপেক্ষাকৃত ছোট একটি ছবি স্থান পেয়েছে। ১৯৯৬ সালে প্রথম মেয়াদে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের ৩০ তলা ভবনের উদ্ভোধন ছবি এটি। ছবির নীচে ক্যাপশন লিখা হয়েছে, “বাংলাদেশ ব্যাংক প্রধান কার্য্যলয়ের দ্বিতীয় সংলগ্নী ভবনের উদ্ধোধন” । কে উদ্বোধন করছেন তার নামটিও লেখা হয়নি।

এ বিষয়ে বইটির প্রকাশনা উপদেষ্টা আল্লাহ মালিক কাজেমির সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের ইতিহাস বইটিতে বঙ্গবন্ধুর ছবি না থাকার কোন কারণ নেই।

তিনি বলেন, বইটি প্রকাশের উপদেষ্টা কমিটিতে আমার নাম থাকলেও বইটি প্রকাশের জন্য খুব বেশি আমাকে ডাকা হয়নি। একেবারে শেষ মুর্হুতে আমাকে ইনভলব করা হয়েছে। তবে বইটি ভালোভাবে না পড়ে এর চেয়ে বেশি মন্তব্য করতে পারছি না।

বইটির কনটেণ্ট থেকে আরও দেখা যায়, এতে স্থান পেয়েছে, সাবেক অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান, আবুল মাল আবদুল মুহিত, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রথম গর্ভনর আ.ন.ম হামিদুল্লাহ, সাবেক গর্ভনর নুরুল ইসলাম, লুৎফর রহমান, ড. মোহাম্মদ ফরাস উদ্দিন আহমেদ, ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ, ফখর উদ্দিন আহমেদ, ড. আতিউর রহমান এবং বর্তমান গর্ভনর ফজলে কবির-এর নানা কার্যক্রমের ছবি।

তবে, বাংলাদেশ ব্যাংকের গর্ভনর ফজলে কবির বইটির ভূমিকা লেখার সময় কিভাবে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে অবহেলার বিষয়টি এড়িয়ে গেলেন তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট অনেক কর্মকর্তা কর্মচারী গর্ভনরের আদর্শ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে গর্ভনর ফজলে কবিরের বিএনপি সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি উঠে এসেছে। এছাড়া বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাসের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা সবারই জানা। এ কারণে ঢাকা ব্যাংক লিমিটেডের অনেক অনিময়মের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ভরযোগ্য সূত্র ভোরের পাতাকে নিশ্চিত করেছেন, প্রধানমন্ত্রী দপ্তরের দুইজন প্রভাবশালী আমলা বারবার গর্ভনর ফজলে কবিরকে সহায়তা করেন নানাভাবে। তাই তিনি নানা অপকর্মে লিপ্ত থাকার পরও কাজ করে যাচ্ছেন। 

বইটির প্রথম প্রকাশনা কমিটির আহ্ববায়ক ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক মাহফুজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের ইতিহাস বইটিতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি নেই, কিন্তু আইয়ুব খানের কয়েকটি ছবি ছাপা হয়েছে- এই বিষয়টি নিয়ে বঙ্গবন্ধুর একনিষ্ঠ ভক্ত সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান এবং আমাকে জড়িয়ে কেউ কেউ উদ্দেশ্য প্রণোদিত স্ট্যাটাস, মন্তব্য, সংবাদ পরিবেশন করছেন। এখানে পরিষ্কারভাবে জানাচ্ছি যে, বাংলাদেশ ব্যাংকে আমার সর্বশেষ কর্মদিবস ছিল ২৯ অক্টোবর, ২০১৫ (পরের দুদিন সাপ্তাহিক ছুটি); অন্যদিকে আতিউর রহমান স্যারের শেষ কর্মদিবস ছিল ১৫ মার্চ, ২০১৬। আর এই বিতর্কিত ইতিহাস বইটি প্রকাশিত হয়েছে ডিসেম্বর, ২০১৭ মাসে। এই সুদীর্ঘ সময় পরেও আলোচ্য কাজে কেন এবং কীভাবে আমরা দায়ী হলাম, বুঝতে পারছি না। নোট ও কয়েনে, এমনকি নোটের জলছাপে পর্যন্ত জাতির পিতার ছবি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ড. আতিউর রহমান। তাঁর মনে-মননে আছেন বঙ্গবন্ধু। অতএব, তিনি দায়িত্বের আশেপাশে থাকলেও বঙ্গবন্ধুর ছবি ছাড়া এই বই প্রকাশিত হত না।

বই প্রকাশের পর্যায়ে দায়িত্বে কে ছিলেন, ছবিগুলো বাছাইর দায়িত্ব কে পালন করেছিলেন, তাঁর মাথায় পাকিস্তানী ভুত ছিল কি না, এ বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা দরকার।আমি যতদূর জানি, বইটি প্রকাশের পর বঙ্গবন্ধুর ছবি না থাকায় বর্তমান গভর্নর সাহেব হতাশা ব্যক্ত করে বইটির বিতরণ বন্ধ, পুন: পর্যালোচনা এবং নতুনভাবে মুদ্রণের পর প্রকাশ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেই কাজটি এতদিনে হল না কেন, সেটাও দেখা দরকার। কারও ঘাড়ে দায় চাপানোর আগে বিষয়টির আদ্যোপান্ত জেনে নেওয়া প্রয়োজন। কেবল নিরীহ ঘাড় পেলেই বোঝা চাপিয়ে দেবার অভ্যাস পরিত্যাজ্য। বিনয়ের সঙ্গে আরও একটি কথা বলে রাখি, এসব ক্ষেত্রে পিলো-পাসিং-এ যারা অতি দক্ষ, তাদের ক্ষতস্থানের অনেক চিত্র নীরবে হৃদয়ে ধারণ করে চুপচাপ আছি। খোঁচাখুঁচি করে এসব চিত্র বাইরে আনার ব্যবস্থা না করাই ভালো।

উল্লেখ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গর্ভনর ড. আতিউর রহমানের আমলে বইটির প্রকাশের উদ্যোগ নেয়া হয়। তার আমলে বইটির প্রায় অর্ধেক কাজ শেষ হয়। তিনি বিদায় নিলেও বইটির প্রকাশের প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা হয়। বইটি প্রকাশের জন্য ছয় সদস্য বিশিষ্ট একটি উপদেষ্টা কমিটি গঠন করা হয়। 

Ads
Ads