দ্বন্দ্ব ভুলে আওয়ামী লীগের মিলনমেলা

  • ২৮-Nov-২০১৮ ০৬:০০ অপরাহ্ন
Ads

:: সুভাষ চৌধুরী ::

খবরটি নি:সন্দেহে আশাব্যঞ্জক। এই হতাশার জগতে এমন একটি প্রত্যাশার খবর পেয়ে আমি আনন্দে আহ্লাদিত। কারণ এতোদিন ভেবে আসছিলাম ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগকে বুঝি কেউ কেউ তার নিজ বলয় থেকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু পরে দেখছি আমারই ভুল। অন্তত: সাতক্ষীরার প্রেক্ষাপটে বোধ করি দলটি ঠিক ঠিক জায়গায় চলে যাচ্ছে। বিশেষ করে বুধবার দুপুরে সাতক্ষীরা কালেক্টরেট চত্বরে বহুক্ষণ দ-ায়মান থেকে মনে হয়েছিল এখানে বুঝি নির্বাচনী হাট বসেছে। এই হাটে দলে দলে মানুষ বিলাসবহুল গাড়ি ঘোড়ায় পসরা নিয়ে আসছেন। আর আমরা আম জনতা কার পসরা কেমন তা যাচাই বাছাই করার জন্য হা হয়ে তাকিয়ে ছিলাম। নাকে শুকে চোখে দেখে জিহবায় দিয়ে টেস্ট করছিলাম। যে স্বাদ এতে পেলাম তা অন্যদের সাথে কোনো স্থানে মিল আছে আবার কোনো স্থানে ঘোর অমিল। ঠিক যেমন সিক্স ব্লাইন্ড ইন্ডিয়ানসের হস্তি দর্শনের মতো। শুড়ে হাত বুলিয়ে কেউ বলেন, হাতি একটি সাপের মতো। কানে হাত দিয়ে কেউ বলেন, হাতি একটি কুলোর মতো। গোদা পায়ে হাত বুলিয়ে কেউ বলেন, হাতি মানে একটি মোটা খাম্বা। কালেক্টরেট চত্বরে ঠিক এমনটিই মনে হচ্ছিল আমজনতার।

তবে আমাদের সবার নেতা সাবেক সাংসদ মুক্তিযোদ্ধা বর্তমানে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মুনসুর আহমেদ আমাকে বললেন চারদিকে তাকিয়ে দেখুন আওয়ামী লীগের সব অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা দলে দলে চলে এসেছেন মনোনয়ন জমা দেওয়ার সময় সাথী হতে। আসলে একটা কথা সত্য আমাদের মাঝে যদি বা মাঝে মাঝে একটু আধটু দূরত্ব দেখা দেয় তা আবার ঠিক হয়ে যায় নির্বাচন এলে। তখন আমরা আওয়ামী লীগ সবাই এক নৌকায় উঠি। ভেদাভেদ থাকেইনা। এবারও দেখুন তাই কিনা। আমি সায় দিলাম আহমদ ভাইয়ের মন্তব্যে। অবশেষে দিনভর পেশাগত কাজ করে বাসায় ফিরেছি। হঠাৎ খবর এলো জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের কক্ষে বসেছে এক মিলন মেলা। শুনে আরও খুশী হলাম। ছবিতে দেখলাম সাতক্ষীরা সদর আসনের সাংসদ মীর মোস্তাক আহমেদ রবিকে ঘিরে বসে আছেন জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. নজরুল ইসলাম, যুগ্ম-সম্পাদক অধ্যক্ষ আবু আবু আহমেদ, সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান বাবু, সদর উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি এসএম শওকত হোসেন, সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান আলি, পৌর আওয়ামী লীগ সভাপতি আবু সায়ীদ, সম্পাদক শাহাদাত হোসেনসহ অনেক নেতাকে। ছবি দেখে মনটা ভরে গেল।

তখনই আমার ধারনা হলো ক্ষমতাসীন দলটি ঠিক জায়গায় আছে এবং সঠিক পথ বেয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। সাথে সাথে আমার মনে পড়লো কয়েকটি কথা। ২০১৬ এর ২২ মার্চ ইউপি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মধ্যে পরস্পর বিরোধী নেতাদের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হওয়ায় জেলার ৭৮টি ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের অন্তত: ৫৯ জন প্রার্থী বিদ্রোহী হয়েছিলেন। দল তাদেরকে বহিস্কার করেছিল। সে যাত্রা হারজিতের পর দল অবশ্য তাদের বহিস্কারাদের প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। আমারই মনে পড়ে গেল গত ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে শহরের শহীদ আলাউদ্দিন চত্বরে এক আলোচনা সভায় যুবলীগ নেতাদের হাঙ্গামায় বেশ কয়েকজন নেতা আহত হয়েছিলেন।

চেয়ার ছোড়াছুড়ির মধ্য দিয়ে তান্ডব চালানো হয়েছিল। মঞ্চে তখনও উপস্থিত ছিলেন সদর আসনের সংসদ সদস্য মীর মোস্তাক আহমেদ রবি ও সাবেক সংসদ সদস্য মুনসুর আহমেদসহ অনেক নেতা। এ ঘটনায় যুবলীগ নেতা আব্দুল মান্নান হামলার শিকার হয়ে মারও খেলেন এবং পরে পুলিশের ধাক্কা খেয়ে জেলেও গেলেন। পরে মান্নান বিরোধী অংশটি মিছিল মিটিং করে আব্দুল মান্নানের বহিস্কারও দাবি করলেন বারবার। এমন দ্বন্দ্বের জেরও আমি দেখেছি। আমি দেখেছি জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. নজরুল ইসলাম বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে জেলা পরিষদ নির্বাচন করেছেন। জয়লাভের পর তিনি যেদিন দায়িত্ব গ্রহণ করেন সেদিন দলের এক শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন নেতা নানাভাবে বিষোদগার করছেন। এতে ফুটে উঠলো তাদের অভ্যন্তরীন দ্বন্দ্বের কথা। নিজেদের মধ্যে দুরত্বের প্রকাশ ঘটলো। সাতক্ষীরা পৌর নির্বাচনে একইভাবে দলীয় অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণে ফলাফল চলে গেল বিএনপির ঘরে। শুধু আমি নই, আমজনতা আরও লক্ষ্য করেছে, যে মঞ্চে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম রয়েছেন সেই মঞ্চ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন সংসদ সদস্য মীর মোশতাক আহমেদ রবি। এমনই একটি ঘটনা উল্লেখ করতেই হয় গত অক্টোবরে দুর্গাপূজার মহানবমীতে সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের সম্প্রীতির সেতুবন্ধন অনুষ্ঠানে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানকে লক্ষ্য করে সংসদ সদস্যের অশোভন ভাষা উচ্চারণ। এর ফলে খোদ মিডিয়াকর্মীরাও প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন। সংসদ সদস্য নিজের মত করে বেশ কিছু বাংলা ইংরেজী ঝাকুনি বকুনি দিয়ে আলোচনা মঞ্চ ছেড়ে চলে গেলেন। এতে ফুটে উঠলো দলের ভেতরকার জগাখিচুড়ি অবস্থা। এ ঘটনা সাতক্ষীরা আওয়ামী লীগ জগতে বিরুপ প্রভাব ফেলেছিল।

এরপরই সংসদ নির্বাচনের বাদ্য বাজনার সাথে সাথে অনেকেই প্রার্থী হবার আগ্রহ নিয়ে জনগণের দ্বারে গেছেন। তারা ঢাকায় ছুটাছুটি করেছেন। শেষ ফল তারা যেটা পেয়েছেন সাতক্ষীরার ৪টি আসনেই যারা সংসদ সদস্য ছিলেন তাদেরকেই স্ব স্ব এলাকায় নৌকার প্রার্থী হিসেবে কেন্দ্র প্রাথমিক ঘোষণা দিয়েছে। এতে আর যাই হোক দলীয় দ্বন্দ বিভেদকে প্রকাশিত হতে না দিয়ে শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন দল আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতাকর্মীদের পরস্পরের চাহিদাকে শান্ত অবস্থায় রেখেছেন। এই মনোনয়ন পাওয়া না পাওয়ার মধ্যে যেমন কোন ব্যর্থতার প্রকাশ নেই তেমনি সফলতার বহি:প্রকাশও ঘটছে না এই কারণে যে ৪টি আসনের নির্বাচিত সংসদ সদস্যরাই নিজ নিজ জায়গায় রয়েছেন। বলা যায় তারা বিনা যুদ্ধে বীরের জয় লাভ করেছেন। মহাজোটগতভাবে তাদের অবস্থান কেমন হবে সেটা অবশ্য ভবিষ্যতই বলতে পারবে। জেলার কোনো অনুষ্ঠানের নিমন্ত্রণপত্রে কারও কারও নাম দেখে তেলেবেগুনে জ¦লে উঠছিলেন দুই একজন অহংকারী নেতা। শেষতক বর্জনও করেন সে অনুষ্ঠান।

এমন অবস্থায় দলের মিলনমেলা দেখে আমার মনে হয়েছে আওয়ামী লীগ আবারও দ্বন্দ্ব ভুলে ভালো জায়গায় যাবার চেষ্টা করছে। তবে কেউ যদি জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের কক্ষে অনুষ্ঠিত বুধবারের এই মিলনমেলাকে কেবলমাত্র লোকদেখানো ভাব দেখিয়ে আবারও অহংকারের গহীন জগতে ফিরে যেতে চান তবে তিনি ভুল করবেন। কারণ আওয়ামী লীগ একটি তৃণমূলের দল। এর সঙ্গে রয়েছে কোটি কোটি জনতার রক্ত হৃদসম্পর্ক। এই সম্পর্ক বজায় রাখতে হলে নেতাদের অহংকার, বড়াই, নিজেকে বেশি বড় করে দেখা, অন্যদের অবমূল্যায়ন করা কোনভাবেই গ্রহনযোগ্যতা পাবে না। ইংরেজী বাংলা সংমিশ্রন ঘটিয়ে আমজনতাকে হেলাফেলা করা যাবেনা। আমজনতা যদি বুঝতেই পারে অহংকারী সেই নিজ জায়গায়ই রয়েছেন তাহলে তারা কালেক্টরেট চত্বরে বুধবার যে পসরা দেখেছেন তার মধ্যে কোনটি বেছে নেবে তা কিন্তু বলা কঠিন। এই প্রসঙ্গে সাতক্ষীরা সফররত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সেই দিনের রাজ্জাক পার্কের মঞ্চের দৃশ্যের কথা তুলে ধরে বলতে চাই, নেতাদের হাতে হাত মিলিয়ে দিয়েছিলেন তিনি এবং বলেছিলেন কেবলমাত্র শোডাউন দেখিয়ে পোস্টার ব্যানার টানিয়ে, রঙিন ছবি ঝুলিয়ে দলীয় মনোনয়ন পাওয়া যাবে না। দলীয় মনোনয়ন পেতে হলে জনগণের দ্বারে যেতে হবে। জনগণের রিপোর্ট অনুযায়ী সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এর আগে ২০১৭ এর ৩ মে তারিখে তিনি ঢাকায় ডেকে নিয়ে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সম্পাদক ও তিন সংসদ সদস্যকে বসিয়ে বিরোধের নিষ্পত্তি করে দেন। তিনি একই সালের ১২ ডিসেম্বর সাতক্ষীরা শহীদ রাজ্জাক পার্কের আওয়ামী লীগের জনসভায় মঞ্চ থেকে কোনো কোনো নেতাকে নামিয়ে দিয়েছিলেন।

তিনি তার ৪৫ মিনিটের বক্তৃতায় বলেন, আপনারা যারা ঢাকায় বসে হ্যাট কোট পরে গাড়ি হাঁকিয়ে নেতা নেত্রীর সামনে হাজির হয়ে গা দেখিয়ে নির্বাচনে মনোনয়ন পাবেন মনে করেছেন তারা বোকার স্বর্গে বাস করছেন। নিজ নিজ এলাকায় পোস্টার ব্যানার বিলবোর্ড টানিয়ে লিফলেট ছড়িয়ে রমরমা প্রচার চালিয়েই মনোনয়ন পেয়ে যাবেন তাও কিন্তু নয়। পাঁচ হাজার মোটর সাইকেলের বহর নিয়ে শো ডাউন করে মনোনয়ন পাবেন তা হবেনা। কারণ মনোনয়ন পেতে হলে আপনাকে যেতে হবে জনগণের কাছে। তিনি বলেন, দল এখন ক্ষমতায়। তাই ফুরফুরে মেজাজে আছেন সবাই। দল যখন ক্ষমতায় থাকবে না তখন পাঁচ হাজার ওয়াটের বাতি জ¦ালিয়েও আপনাদের খোঁজ পাওয়া যাবে না।

তাইতো বলি অহংকার ভুলে যান। না হলে রাজনীতির ময়দান থেকে হোটেলে ফিরে যান। সেখানে পসরা নামান। আমজনতাকে ডেকে চেখে দেখতে বলুন আপনার পসরা কেমন ভালো না মন্দ।

পাদটীকা:
একজন লোক যিনি থাকেন শুধু ঢাকাতে
মাঝে মধ্যে আসেন এই সাতক্ষীরার মাটিতে
বলেন খুব ভালো লাগে অহংকার দেখাতে
পারি যদি ঠেলে ফেলি গ্রামের আমজনতাকে
কাছে এলে ঘেন্না লাগে
মাঝে মাঝে ডরও লাগে
তবে ঘুষ দিলে ভালো লাগে
এমন দাম পাই কি আর ঢাকাতে?

লেখক: সাতক্ষীরা করেসপন্ডেন্ট, এনটিভি ও দৈনিক যুগান্তর

Ads
Ads