অধরা খুনিদের যেকোনো মূল্যে ফিরিয়ে এনে ফাঁসিতে ঝোলাতে হবে

  • ১৪-Aug-২০১৮ ০৬:০০ অপরাহ্ন
Ads

গতকাল ছিল শোকাবহ ১৫ আগস্ট। স্বাধীনতার স্থপতি, মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক, বাঙালি জাতির মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৩তম শাহাদাতবার্ষিকী। 

১৯৭৫ সালের এইদিন কাকডাকা ভোরে ঘটেছিল ইতিহাসের সেই মর্মবিদারী কলঙ্কজনক ঘটনা; যে ঘটনায় সেনাবাহিনীর কতিপয় রগরগে উচ্ছৃঙ্খল ও বিপথগামী সৈনিকের হাতে সপরিবারে প্রাণ দিয়েছিলেন বাঙালির ইতিহাসে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সন্তান, স্বাধীনতার অবিসংবাদিত স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।  
ঘাতকরা সেই রাতে শুধু বঙ্গবন্ধুকেই হত্যা করেনি, তাদের হাতে একে একে প্রাণ হারিয়েছেন বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, বঙ্গবন্ধুর সন্তান শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শিশু শেখ রাসেলসহ পুত্রবধু সুলতানা কামাল ও রোজি জামাল।

এই জঘন্যতম হত্যাকান্ড থেকে বাঁচতে পারেননি বঙ্গবন্ধুর অনুজ শেখ নাসের, ভগ্নিপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাত, তাঁর ছেলে আরিফ, মেয়ে বেবি ও সুকান্ত, বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে যুবনেতা শেখ ফজলুল হক মণি, তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মণি এবং আবদুল নাঈম খান রিন্টু ও কর্নেল জামিলসহ পরিবারের ১৬ জন সদস্য ও ঘনিষ্ঠজন। এ সময় বঙ্গবন্ধুর দুই মেয়ে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বিদেশে থাকায় প্রাণে রক্ষা পান। আগস্ট মাসটি তাই বাংলাদেশের মানুষের কাছে শোকের মাসে পরিণত হয়েছে।

যেহেতু বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ একই মুদ্রার এ পিঠ ও পিঠ, বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ, তাই ঘাতকরা ভেবেছিল এক বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করলেই বঙ্গবন্ধুর ডাকে অর্জিত বাংলাদেশেরও যুগপৎ মৃত্যু ঘটবে। ফিরে যাবে দেশটি আবার তাদের সেই দিবাস্বপ্নের পাকিস্তানে। অর্থাৎ ঘাতকদের উদ্দেশ্য ছিল মূলত বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে বাংলাদেশকে পুনরায় পাকিস্তানে পুনরুজ্জীবিত করা। সেই কাজটি করতে তারা অনেকদূর এগিয়েও গিয়েছিল। কুচক্রিরা মোশতাককে ক্ষমতায় বসায় মূলত সেই উদ্দেশ্যেই। কিন্তু যে দেশটিতে তখনো বঙ্গবন্ধুর লাখো সৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধারা রয়ে গেছে সে দেশটি তারা পুনরায় পাকিস্তানে রূপান্তরিত করবে, সে কী করে সম্ভব! 

আর তাই তো মোশতাকের পর জিয়া থেকে পর্যায়ক্রমে খালেদা জিয়া পর্যন্ত পাকিস্তানপন্থি সরকার ক্ষমতায় আসলেও ঘাতকদের স্বপ্ন পূরণ হয়নি এই জন্যই মূলত ১৯৮১ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শোণিতপ্রবাহধারী সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তনই ঠেকিয়ে দেয় তাদের একে একে সব ষড়যন্ত্র। শেখ হাসিনার হাতের ছোয়ায় যেন স্ফিংস-এর মতো জেগে ওঠে পুনরায় প্রায় আন্ডার গ্রাউন্ডে চলে যাওয়া আওয়ামী লীগ। ওই প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়েই পাকিস্তানপন্থিদের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। তাই তো অনেক চড়াই-উৎরাই শেষে দীর্ঘ একুশ বছর পর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায় আসে। অতঃপর জিয়াউর রহমানের কুখ্যাত ‘ইনডেমনিটি বিল’ বাতিল করে দিয়ে ১৪ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার কার্যক্রম শুরু হয়। তিন প্রধান আসামি লেফটেন্যান্ট কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী তাহের উদ্দিন ঠাকুরকে গ্রেফতার করা হয়। অতঃপর মামলার বিচারকাজ শেষে আদালত ১২ জনকে মৃত্যুদ-াদেশ দেন। ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঁচ আসামির মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয়। তারা হচ্ছেন  সেনাবাহিনীর সাবেক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ (আর্টিলারি), সাবেক মেজর বজলুল হুদা, লেফটেন্যান্ট কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমান, সাবেক লেফটেন্যান্ট কর্নেল শাহরিয়ার রশিদ খান এবং এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ (ল্যান্সার)।

কিন্তু বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত ও দ-িত ১২ খুনির মধ্যে সাতজন এখনো পলাতক। যাদের মধ্যে একজন জিম্বাবুয়েতে মারা যান। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার দায়ে মৃত্যুদ- মাথায় নিয়ে পালিয়ে থাকা ছয় আসামির মধ্যে চারজনের অবস্থানই শনাক্ত হয়নি ৯ বছরেও। বাকি দুজনের নূর চৌধুরী ও রাশেদ চৌধুরীর অবস্থান বিদেশে শনাক্ত হলেও অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে এখনো দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই।

অথচ বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনি নূর চৌধুরীর রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন নাকচ হওয়ার পর ২০০৬ সালেই তাকে ফেরত পাঠাতে চেয়েছিল কানাডা সরকার। নূর চৌধুরীর কূটনৈতিক পাসপোর্টের পাশাপাশি তাকেও ফেরত দেওয়ার আগ্রহ জানিয়ে বাংলাদেশকে চিঠিও দিয়েছিল। কিন্তু তৎকালীন বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার এ বিষয়ে অনীহা প্রদর্শন করে। আর এর মধ্য দিয়েই নূর চৌধুরীকে ফেরত পাওয়ার মোক্ষম সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যায় বাংলাদেশের। আর এ থেকেই প্রমাণ হয় বিএনপি কখনোই বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার চায়নি। বিচার চাইবেই বা কী করে। যে হত্যাকান্ডে জিয়াউর রহমান সাক্ষাৎ বেনিফিশিয়ারি, যে হত্যাকান্ডের পর মেজর ডালিমকে জিয়া বলেছিলেন ‘ওয়েল ডান ডালিম, কংগ্রাচ্যুলেশন’- সেই জিয়া বা তার দলটি কী করে বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচার চাইতে পারে! তাই তারা ‘ইনডেমনিটি বিল’ অধ্যাদেশের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচারের পথ চিরতরে বন্ধ করে দিতে চেয়েছিল। তবে এখন যেহেতু আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এবং বর্তমান সরকারের সময়েই পাঁচ খুনির ফাঁসি কার্যকর হয়েছে কাজেই এ সরকার ক্ষমতায় থাকতেই বাকি খুনিদের বাংলাদেশে এনে ‘ফাঁসি’তে ঝুলানো হবে সেটাই আমাদের প্রত্যাশা। এখন যে কোনো উপায়েই হোক তাদের ফিরিয়ে আনতে হবে। বঙ্গবন্ধুর চিহ্নিত ঘাতকদের তারা দেশে ফিরিয়ে আনবেনই। আর যাদের অবস্থান এখনো শনাক্ত হয়নি, আইনমন্ত্রীর ভাষায় আমরাও বলতে পারি, আগামীতে আওয়ামী লীগ ফের বাংলাদেশের ক্ষমতায় এসে এই অসমাপ্ত কাজটি সম্পূর্ণ করতে সক্ষম হবে।

Ads
Ads