ফের অনিশ্চয়তার মুখে পড়ল রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন

  • ১৫-Nov-২০১৮ ০৬:০০ অপরাহ্ন
Ads

:: ড.কাজী এরতেজা হাসান ::

গত বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হওয়ার কথা ছিল বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিজ দেশে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া। শেষপর্যন্ত তাও ‘স্থগিত’ হয়ে গেল। এ নিয়ে যা আন্দাজ করা হচ্ছিল তারই বাস্তব প্রতিফলন দেখা গেল এদিন। এ নিয়ে এখন আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতার মুখে বাংলাদেশ। আর এই বাধ্যবাধকতার মুখে থাকাতেই বাংলাদেশ সরকার চাইলেও ‘বলপূর্বক’ভাবে এই রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মিয়ানমারের হাতে তুলে দিতে পারছে না। ফলে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে গত ডিসেম্বরে স্বাক্ষরিত দ্বিপক্ষীয় চুক্তি অনুযায়ী এই রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তন শুরু হওয়ার মধ্যেই একটা গোলমাল বেধে গেল। রোহিঙ্গারা এখন সবাই একযোগে স্লোগান দিচ্ছে, ‘আঁরা ন যাইয়ুম, আঁরা ন যাইয়ুম...’। নিজ জন্মভূমিতে ফিরে যেতে চায় না, পৃথিবীতে কোথাও কি খুঁজে পাওয়া যাবে এমন কোনো মানুষ। পৃথিবীর ইতিহাসে হয়তো এই প্রথম কোনো মানুষের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়ে উঠল, ‘আঁরা ন যাইয়ুম, আঁরা ন যাইয়ুম, এই সমস্বরিত ধ্বনি। এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও তাদের এই স্লোগান থেকে একটা অজুহাত পেয়ে গেল যে, জোর করে শরণার্থীদের পাঠানো যাবে না। আর তা করতে গেলে বাংলাদেশকে হয়তো বড় ধরনের আন্তর্জাতিক শাস্তির মুখেও পড়তে হতে পারে। বিপদতাড়িতদের আশ্রয় দিতে গিয়ে যেন এখন বাংলাদেশই বিপদে পড়লো। 

ইতোমধ্যেই অনেক রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের ভয়ে ক্যাম্প ছেড়ে পালানো শুরু করেছে। এমনিতেই তারা আগে থেকেই ক্যাম্প ছেড়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় ঠাঁই নেয়। অনেকে ধরাও পড়ে ফের ক্যাম্পে আসতে বাধ্যও হয়। 
অথচ যৌথ কর্মদলের প্রথম সভায় বাংলাদেশের পক্ষে আট হাজার রোহিঙ্গার যে তালিকা দেওয়া হয়েছিল, সেখান থেকে ‘যাচাই-বাছাই’ করে প্রথম ধাপে সাড়ে চার হাজার ফেরত নিতে সম্মত হয়েছিল মিয়ানমার। চুক্তি অনুযায়ী, ১৫ নভেম্বর থেকে প্রতিদিন ১৫০ জন করে ফিরে যাওয়ার কথা ছিল।  দেখা গেল যে, চুক্তি অনুযায়ী প্রথম কিস্তির সেই রোহিঙ্গার অনেকেই পালিয়ে গেল। যারা ছিল তারা স্লোগান দিল, ‘আঁরা ন যাইয়ুম, আঁরা ন যাইয়ুম’... এর নেপথ্যের কারণ আর কিছুই নয়; কেননা এরই মধ্যে গত মঙ্গলবার রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া স্থগিতের আহ্বান জানিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনার মিশেল বাশেলেটের একটি বিবৃতি। তাতে তিনি বলেছেন যে, রাখাইনে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হওয়ার আগে ফেরত পাঠানো হলে নিপীড়নের মুখে পালিয়ে আসা ওই জনগোষ্ঠীর জীবন ফের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তবে বাংলাদেশে সরকার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সকল বাধা উপেক্ষা করে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনে বদ্ধপরিকর। অন্যদিকে, মিশেল বাশেলেট তার বিবৃতিতে বলেছেন, শরণার্থীদের বলপূর্বক ফেরত পাঠানো হলে তা হবে ‘আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন’।

অন্যদিকে নাগরিকত্বের প্রশ্নে ইতিবাচক কোনো সিদ্ধান্তের কোনোই ধার ধারেনি মিয়ানমার। তারা রোহিঙ্গাদের চেয়েছিল যেন মানুষ হিসেবে নয়, পশুর পাল হিসেবেই নিয়ে পশুর পালের মতোই নির্দিষ্ট ডেরায় আটকে রাখতে চেয়েছিল। যেখানে তাদের স্বাধীন চলাচলের কোনো সুযোগ থাকবে কি-না সে বিষয়ে কোনোই নিশ্চয়তা ছিল না দেশটির তরফ থেকে। সেখানে তাদের চলাফেরার স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করা হয়নি। এ অবস্থায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ফলে সেখানকার পরিবেশ রোহিঙ্গাদের কতোটা অনুকূলে থাকবে সে উদ্বেগ থেকেই জাতিসংঘ এই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া স্থগিতের আহ্বান জানিয়েছে। 

তবে বাংলাদেশ বরাবরই জানিয়ে আসছে যে, রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে, কাজেই রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানও মিয়ানমারকেই নিতে হবে। তবে এখানেও একটা প্রশ্ন উঠতে পারে। সংকট যেহেতু মিয়ানমারেই তাহলে বাংলাদেশ কেন গণহারে তাদের আশ্রয় দিতে গেল? এর উত্তর, ‘মানবিক কারণে’। তাহলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও এই প্রশ্ন তোলতে পারে, তাহলে ‘বলপূর্বক তাদের পাঠানো হলে সেটা ‘মানবিক’ হবে কি-না? কী উত্তর দেবে তখন বাংলাদেশ? ফলে কঠিন উভয়-সংকটেই যেন পড়লো বাংলাদেশ সরকার।

তারপরও তো আমরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্দেশে এই প্রশ্ন রাখতে পারি যে, যুগের পর যুগ এতোদিন ধরে যে রোহিঙ্গারা নাগরিকত্বহীন ছিল তখন কোথায় ছিল এই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, জাতিসংঘে মানবাধিকার প্রশ্ন? এখন বাংলাদেশের ওপর প্রায় বারো কোটি রোহিঙ্গার বোঝা চাপিয়ে তারা কতোদিনে তাদের ‘নাগরিকত্ব’ আদায় করবে? দেশটিতে অবাধ চলাচলের সুযোগ সৃষ্টি করবে? এতোবড় একটা আন্তর্জাতিক সংস্থাকে মাত্র একটি ছয় লাখ বর্গমাইলের দেশটিকে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দিতে বাধ্য করতে এতো সময় লাগবে কেন? এ অবস্থায় এহেন ছুতা ধরে যদি ফের রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন স্থগিত রাখা হয় তাহলে বরং সেটা মিয়ানমারকেই উৎসাহিত করা হয়। কেননা, মিয়ানমার তো এটাই চাইবে। এমনিতেই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া তারা মাসের পর মাস বিলম্বিত করে আসছে। এখন কি তবে জাতিসংঘ তাদের সেই ইচ্ছাকেই আরো প্রলম্বিত করতে চায়? এ দিকে ক্যাম্প থেকে শত শত রোহিঙ্গা পালাতে শুরু করেছে। এটা বাংলাদেশ সরকারের জন্য নতুন সংকটের সৃষ্টি হবে। সামনেই নির্বাচন। এখন সুযোগসন্ধানীরা তাদেরকে ব্যবহার করে নির্বাচনকে ঘিরে কোনো অচলাবস্থার সৃষ্টির প্রয়াস পায় কিনা সেটাও উদ্বেগের বিষয় বটে।   

আমাদের প্রশ্ন হচ্ছে, নিবন্ধিত ১১ লাখ রোহিঙ্গার মধ্যে মাত্র সাড়ে চার হাজার প্রত্যাবর্তনের ক্ষেত্রেই যদি এই পরিস্থিতি হয়, তাহলে বাকিরা যাবে কীভাবে? আমরা এও জানি, শরণার্থী শিবিরের বাইরে বিপুলসংখ্যক অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী রয়েছে। গত বছর নতুন করে সহিংসতার আগে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের একটি অংশ গত দুই-তিন দশকে নৃতাত্ত্বিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক আনুকূল্য নিয়ে মূল ¯্রােতে মিশেও যেতে পেরেছে। গত বছর আসা রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রেও কি একই পরিণতি চাইছে কেউ কেউ? এ অবস্থায় আমরা মনে করি, বাংলাদেশের সমাজ, শৃঙ্খলা ও অর্থনীতির জন্য এই প্রবণতা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। আমরা নিশ্চয়ই নিপীড়িত একটি জনগোষ্ঠীর প্রতি সহানুভূতিশীল। আমরাও চাই মিয়ানমারের সব নাগরিক অধিকার ও মর্যাদা সহকারে বসবাস করুক; কিন্তু সেই দায় কাঁধে নেওয়ার সামর্থ্য বাংলাদেশের আছে কি-না সেটাও তো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দেখতে হবে। আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কাছে রাখাইনের অঘটনমুখর ও অনিশ্চিত জীবনের তুলনায় হয়তো শরণার্থী জীবনই শ্রেয় মনে হয়েছে। আমরা দেখছি, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পক্ষও এটা বলতে চাচ্ছে যে, রাখাইনের পরিস্থিতি এখনও রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের অনুকূল নয়। সে কারণে রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে কর্মরত উন্নয়ন ও মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলো বাংলাদেশ সরকারের কাছে এখনই প্রত্যাবর্তন শুরু না করার দাবিও জানিয়েছে। 
আমরা মনে করি, রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন বিষয়ে ইতোমধ্যে যে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যত কঠিনই হোক তার বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। নয়তো মিয়ানমারের পক্ষে ঠুনকো অজুহাত তুলে হাত গুটিয়ে বসে থাকা সহজ হবে। এ ক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদের কার্যকর প্রত্যাবর্তনে মিয়ানমারের ওপরই চাপ সৃষ্টি করতে হবে জাতিসংঘসহ এ যাবৎ বাংলাদেশের অনুকূলে থাকা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও। 

তা ছাড়া মিয়ানমার রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের  দৃশ্যমান ‘আন্তরিকতা’ দেখাচ্ছে, তাতেও অনেক লম্বা সময় লেগে যাবে। কিংবা কোনো ছুতায় তা আবার স্থগিতও করে দিতে পারে দেশটি। যা তারা ইতিপূর্বে পুরানো রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ক্ষেত্রে করেছেও। ফলে স্বাভাবিক কারণেই বাংলাদেশেও ফের রয়ে যেতে পারে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশে অবস্থানকালে তাদের খাদ্য, বাসস্থানসহ অন্যান্য মৌলিক চাহিদা পূরণ একটা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠবে। বাংলাদেশকে এমনিতে বহুবিধ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়। এখন উটকো চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার ক্ষেত্রে আমরা চাই না অনাকাক্সিক্ষত নতুন কোনো সংকট জড়িয়ে পড়–ক। কাজেই জাতিসংঘ, ওআইসিসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে রাখাইনে রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টির পাশাপাশি এখানে অবস্থানরতদের মানবিক সহায়তাও অব্যাহত রাখতে হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দেখতে হবে দু’তরফেই। একচক্ষু হলে হবে না। যেভাবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন স্থগিত করা হলো তাতে করে বরং বাংলাদেশকে বিপদের মুখে ঠেলা দেওয়া হলো বলে আমরা মনে করি। পাশাপাশি রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্যও এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ আরো দীর্ঘায়িত করা হলো বলে মনে করি আমরা।

Ads
Ads