সম্ভাব্য প্রার্থীর হলফনামা: গরমিলে যথাযথ ব্যবস্থাই বাঞ্ছনীয়

  • ১৯-Nov-২০১৮ ০৬:০০ অপরাহ্ন
Ads

:: ড.কাজী এরতেজা হাসান ::

এবার আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থীদের হলফনামার সম্পদের হিসাবে নজর রাখার কথা জানিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। কাজেই স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ও বার্ষিক আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রার্থীরা সঠিকভাবেই দেবেন বলে প্রত্যাশা করছেন দুদক চেয়ারম্যান। তবে তথ্য গোপন করা, তথ্যের এদিক-সেদিক করা নতুন কিছু নয়। আমরা বরাবরই প্রতিটি জাতীয় সংসদে এটা দেখে আসছি। শুধু তাই নয়, প্রায় প্রতিটি সেক্টরেই প্রকৃত তথ্য গোপন করা একটা চারিত্র্যের অংশ হয়ে গেছে আমাদের জনসমাজের মধ্যে। এমনকি দেখা যায়, বিভিন্ন বিষয়ের ওপর যে জরিপ কাজ চলে সেখানেও প্রকৃত তথ্যের সঙ্গে প্রণয়ন করা তথ্যের কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায় না।

এটা শুধু আমাদের দেশেই নয়, আমেরিকার মতো উন্নত দেশেও দেখা যায়। আর বাংলাদেশে তো এটা একটা ক্রনিক রোগে পরিণত হয়েছে। তবে সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে যদি এ তথ্য গোপন থাকে তাহলে তাদের দ্বারা জাতি কী আশা করতে পারে? যারা জাতির জন্য আইন প্রণয়ন করবেন তারাই যদি ‘মিথ্যুক’ হন, তাহলে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে তারা কী সততার পরিচয় দেবেন? দেখা যায় যে, প্রার্থীর হয়তো শিক্ষাগত যোগ্যতা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত তিনি হলফনামায় দিয়ে বসলে এইচএসসি পর্যন্ত। তার সম্পদ হয়তো পাঁচশ কোটি টাকার তিনি হলফনামায় তা দিলেন পঞ্চাশ কোটি টাকার। কেননা, তাকে যদি সব সম্পদের হিসাব দিতে হয় তখন প্রশ্ন উঠতে পারে সে সম্পদ তিনি কীভাবে অর্জন করেছেন। তখন নিশ্চয় তার কাছে গ্রহণযোগ্য কোনো উত্তর থাকবে না। সেজন্যই প্রার্থীরা এক্ষেত্রে তথ্য গোপন করেন। যাতে করে সাংসদ হয়ে বা মন্ত্রী হয়ে আরো সম্পদ বাড়ানোর সুযোগ থাকে। আর যার বেশিরভাগই হবে অবৈধ। 

আর তাই দুদক সম্ভাব্য প্রার্থীদের হলফনামায় অর্থ-সম্পদের বৈধতা ও যথাযথ উৎস থাকার ওপর জোর দিয়েছে। আয়কর নথির হিসাবের সঙ্গে হলফনামার হিসাবের মধ্যে কোনো গরমিল থাকা যাবে না। কোনো প্রার্থীর হলফনামার হিসাব অস্বাভাবিক ও সন্দেহজনক মনে হলে তা অনুসন্ধান করা হবে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় আনা হবে। এর আগেও দুদক একাধিক প্রতিমন্ত্রী-এমপির হলফনামার সম্পদ অনুসন্ধান করে আইনি ব্যবস্থা নিয়েছে। এবারও কমিশন হলফনামার অস্বাভাবিক সম্পদ অনুসন্ধানে নামবে। আমরা মনে করি, এটা যথাযথভাবে সম্পন্ন হলে তথ্য গোপনকারী সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। পাশাপাশি অসৎ প্রার্থীর সংখ্যা কমে আসবে। দুর্নীতির ক্ষেত্রও আর প্রসারিত না হয়ে বরং সংকোচিত হয়ে আসবে। আমাদের বিশ্বাস, জনপ্রতিনিধি হতে ইচ্ছুক প্রত্যেকেই তার হলফনামায় প্রকৃত সম্পদের সব রকমের হিসাব দেবেন। কোনো লুকোছাপা করবেন না। এ হিসাব যেন আয়কর রিটার্নের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। সাধারণত ‘হাইব্রিড’ নেতারাই অধিকহারে তাদের তথ্য গোপন করে থাকেন। 

নির্বাচন কমিশন (ইসি) সূত্রে জানা গেছে, হলফনামায় সংশ্নিষ্ট প্রার্থীর ও তার পরিবারের সদস্যদের আয়ের উৎস হিসেবে কৃষি, ব্যবসা, বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট, দোকান, শেয়ার, সঞ্চয়পত্র, ব্যাংক আমানত, পেশা ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক তথ্য জানাতে হবে। আমরা দেখেছি যে, ভারতের সাধারণ নির্বাচনের আগে সে দেশের মানুষ বর্তমান ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে ‘চিরকুমার’ বলেই জানত। কিন্তু তিনি নির্বাচনী হলফনামায় উল্লেখ করতে বাধ্য হলেন যে, তিনি ‘চিরকুমার’ নন; বিবাহিত। হলফনামা হচ্ছে সেরকমই। কোনো তথ্যই গোপন রাখা যাবে না। যাতে সমাজে ও জনগণের মাঝে পরবর্তীতে কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি না হয়। যদি তাকে সেরকম তথ্য গোপনকারীই হতে হয়, আর যদি তা পরে প্রকাশ হয়ে পড়ে, তাহলে তিনি আর কীসের আইনপ্রণেতা?

Ads
Ads