এখন টেকসই উন্নতির মজবুত ভিত চাই

  • ২৪-Nov-২০১৮ ০৬:০০ অপরাহ্ন
Ads

:: ড.কাজী এরতেজা হাসান ::

এতে কারোরই কোনো সংশয় প্রকাশ করার অবকাশ নেই যে, গত ১০ বছরে দেশে যতো উন্নয়ন হয়েছে, তা বর্তমান সরকারের রাষ্ট্র পরিচালনায় দক্ষতারই পরিচায়ক। যদিও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জরিপে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশ দেশি-বিদেশি সব ধরনের বিনিয়োগের মানদ-ে বেশ পিছিয়ে আছে। এর কারণ হিসেবে বলা হয়, বাংলাদেশে এখনো বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি হয়নি। যে কারণে আগ্রহী বিদেশি বিনিয়োগকারীরা পার্শ্ববর্তী অন্যান্য দেশকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। এমনকি আফ্রিকার এককালের গৃহযুদ্ধে বিধ্বস্ত দেশ রুয়ান্ডাও এখন বিনিয়োগ আকর্ষণের দিক থেকে বাংলাদেশের অনেক ওপরে চলে গেছে। আরো দুর্বিষহ অভিজ্ঞতা যে, এক্ষেত্রে একসময়ের যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ আফগানিস্তানও বাংলাদেশের চেয়ে অনেক এগিয়ে গেছে। যেখানে এখনো বাংলাদেশের জঙ্গিদের চেয়েও শতগুণ বেশি ভয়ঙ্কর মৌলবাদ বিদ্যমান ও নিত্য আত্মঘাতী বোমা হামলায় জর্জরিত। অথচ বাংলাদেশ আফাগানিস্তানের চেয়েও অনেক বেশি শান্তি বিরাজ করছে। তারপরও দেশটি কেন ওই দেশগুলোর বেয়ে বেশি বিনিয়োগবান্ধব হয়ে উঠছে না? ফলে এই প্রশ্নের সুরাহা করতেই এখন এই বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টিই হচ্ছে বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক ভাষণেও সে কথা উঠে এসেছে। তিনি বলেছেন, বর্তমানে দেশ রাজনৈতিক কূটনীতির পরিবর্তে অর্থনৈতিক কূটনীতিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। হ্যাঁ, এই অর্থনৈতিক কূটনৈতিক দক্ষতার ক্ষেত্রেই ওই দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে আছে। তার ওপর জানা যায়, বাংলাদেশের কূটনৈতিকরা ইংরেজিতে যথেষ্ট সাবলীল ও সহজাত নয়। ফলে ল্যাঙ্গুয়িস্টিক কমিউনিকেশনে আমাদের কূটনৈতিকরা যথেষ্ট পিছিয়ে রয়েছে।  

এ অবস্থায় কেবল বিদেশিদের কাছে আবেদন জানালে হবে না, বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশও তৈরি করা জরুরি। বর্তমান সরকার দেশে বেশ কয়েকটি রফতানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা ও অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে। এর বেশ কিছুতে বাস্তবায়নের কাজ এগিয়ে গেছে। এগুলোর মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকা- যেমন বাড়বে, তেমনি কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে বলে সবাই আশা করছেন। বাংলাদেশে বর্তমানে শিক্ষিত বেকারের হার অত্যন্ত প্রকট। যে প্রকৃত তথ্যটি বিবিএস এর প্রতিবেদনেও চেপে যাওয়া হয়। যেখানে তারা মাত্র ২৬ লাখ বেকারের সংখ্যা উল্লেখ করে থাকে। অথচ এর চেয়ে নির্জলা মিথ্যা আর হয় না। প্রকৃত বাস্তবতা হচ্ছে, দেশে সর্বমোট তরুণ বেকার প্রায় চার কোটির বেশি। এটি মারাত্মক একটি নেতিবাচক চিত্র। আর অনুমোদন, ব্যাংক লেনদেন, ঋণ, কর সুবিধা, লাভ স্বদেশে নেওয়ার শর্তাদি এবং পুনর্বিনিয়োগ ইত্যাদি পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে।

আমাদের এ বিষয়টি এড়িয়ে গেলে চলবে না যে, একদিকে অর্থনীতির সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক আরেকদিকে রাজনীতির সঙ্গে অর্থনীতির গভীর সম্পর্ক নতুন কোনো বিষয় নয়। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অর্থনীতির অগ্রগতির স্বার্থে রাজনীতিকে ব্যক্তির উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয় না। কিছু নর্ম স্বাভাবিকভাবে রাখা হয় ব্যবসায়িক স্বার্থকে রাজনীতি থেকে আলাদা করার জন্য। নতুবা পুরো ব্যবস্থাটিই ভেঙে পড়ার আশঙ্কা থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে অন্যতম লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে রাজনীতি। এ জন্যই সম্প্রতি রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ তার এক বক্তব্যে বলেছেন, ‘এখন রাজনীতি হচ্ছে গরিবের বউ-এর মতো’। এর আগে ড. মুহম্মদ ইউনূসও বলেছিলেন যে, এ দেশে রাজনীতি করা হয় টাকা বানানোর স্বার্থে। তবে রাজনীতি ‘গরিবের বউ’ হোক, আর ‘টাকা বানানোর হাতিয়ার’ হোক, গণতন্ত্রে রাজনীতি আসলেই অবাধ। রাজনীতির দরজা এখানে সবার জন্যই খোলা।

ব্যবসায়ীদের জন্যও খোলা। আমলাদের জন্যও খোলা। তবে রাজনীতিতে কোন পেশার লোকজনের দাপট বাড়ছে বা রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ কাদের হাতে চলে যাচ্ছে, সেটা অবশ্যই আলোচনা, পর্যালোচনা ও গবেষণার বিষয়। সম্প্রতি ইউনাইটেড নেশনস কনফারেন্স অন ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আঙ্কটাড) একটি প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে বক্তারা বাংলাদেশের রাজনীতি ও ব্যবসা নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। তারা বলেছেন, নাগরিকরা এখন বুঝতে পারছে না কে রাজনীতিবিদ আর কে ব্যবসায়ী? তাদের সামনে দৃশ্যমান হচ্ছে বাংলাদেশে রাজনীতি একটি বড় ব্যবসায় উদ্যোগ। নির্বাচনে ব্যবসায়ীগোষ্ঠীর যথেষ্ট দৃশ্যমান উপস্থিতি। ব্যবসায়ীগোষ্ঠী প্রয়োজন বোধ করছে রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার। কারণ যেসব সুযোগ-সুবিধা অনেক ক্ষেত্রে তারা পেয়েছেন এবং পাচ্ছেন, সেটা একমাত্র রাষ্ট্রীয় প্রশ্রয়েই সম্ভব। কর অবকাশ থেকে লাইসেন্স, নতুন ব্যাংকের অনুমোদন সবই এ প্রশ্রয়ের ওপর হয়েছে। সেজন্যই রাজনীতি দিয়ে রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে তারা নিজেদের সুরক্ষা দিতে চান। এ কারণে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা ব্যক্তির সম্পদ বাড়ছে জ্যামিতিক হারে। ফলে বৈষম্য বেড়ে যাচ্ছে দ্রুতগতিতে। 

দেশের গণতন্ত্রের চরিত্র, অবস্থা ও ভবিষ্যতের সঙ্গে রাজনীতির অবশ্যই একটা সম্পর্ক রয়েছে। ব্যবসা ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে রাজনীতির একটি সম্পর্ক সবসময়ই ছিল। বিশ্বের সব দেশেই রাজনীতিবিদ এবং দলগুলোর চাঁদা ও অনুদানের বড় অংশের জোগান আসে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেই। ব্যবসায়ীর অর্থের জোগান ছাড়া রাজনীতি একেবারেই অচল বলতে হবে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। আমাদের দেশে সেই পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে যখন রাজনীতিতে ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণ ছিল খুবই কম, তখনো রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থের উৎস ছিলেন ব্যবসায়ীরাই। তবে তখন ব্যবসায়ীরা রাজনীতিতে সরাসরি আসতে চাইতেন না। বরং রাজনীতি বিমুখই ছিলেন। এখন ব্যবসায়ীরা একদিকে যদি রাজনীতিক হন অন্যদিকে ব্যবসায়ীও তখন তার ব্যবসায়ের দেখাশোনা, নিত্য-নতুন বিনিয়োগ, এসব করবেটা কে? রাজনীতিতে ব্যবসায়ীদের জড়িয়ে পড়া ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে এবং রাজনৈতিক দলগুলো এর পৃষ্ঠপোষকতা করে গেছে। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে নির্বাচিত আইনপ্রণেতাদের মধ্যে মাত্র ৪ শতাংশ ছিলেন ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি। ২০০৯ সালের নবম সংসদে ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি ছিলেন ৬৩ শতাংশ!

নির্বাচন করে জেতার পর ব্যবসা করাটা এখানে খুব সহজ হয়ে যায়। পরিস্থিতির উন্নয়ন না ঘটালে বৈষম্য আরো বাড়বে, যা টেকসই অর্থনীতি প্রতিষ্ঠায় প্রতিবন্ধকও। ব্যবসা ও রাজনীতির এ সম্পর্ক না ভাঙলে ছোট ও সৎ উদ্যোক্তারা ক্রমেই হারিয়ে যাবেন। অশুভ সম্পর্কের কারণে ব্যবসায় সাধারণের প্রবেশ দুরূহ হয়ে পড়েছে, যার প্রভাব ব্যক্তিবিনিয়োগের তথ্যে প্রকাশ পায়। এ হচ্ছে দেশের অভ্যন্তরীণ দিক। আর বাইরে থেকে যে এখানে বিনিয়োগ বাড়ছে না তার কারণও কিন্তু এই রাজনীতি। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। স্থিতিশীলতার অভাব। সর্বোপরি আমাদের কুটনৈতিকদের ব্যর্থতা।  এ অবস্থায় আমরা আশা করব, বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনারদের যথাযথ পরামর্শ প্রদান ছাড়াও দেশে বিনিয়োগনীতি ও সংশ্লিষ্ট আইনগুলো সহজ করতে হবে।

আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতা পরিহার করতে হবে। যে অভিযোগ করে থাকেন বিনিয়োগকারী বিদেশি ব্যবসায়ীরা। শুধু তাই নয়, দেশের বিনিয়োগকারী বা অভিবাসী বাংলাদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকেও এই একই অভিযোগ পাওয়া যায়। কাজেই আমরা মনে করি, বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নতি না ঘটিয়ে অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে টেকসই করা যাবে না। নির্বাচনকে সামনে রেখে যতোই জনতুষ্টিকর ইশতিহার দেওয়া হোক না কেন। এক্ষেত্রে এখন টেকসই উন্নতির মজবুত ভিত চাই। আর নির্বাচনী ইশতিহারে সে লক্ষ্যের দিকেই জোর দেওয়া হবে, সেটাই প্রত্যাশিত।  

Ads
Ads