সিজিএসের সেমিনার: সুষ্ঠু নির্বাচনের দায় সবাইকেই নিতে হবে

  • ২৫-Nov-২০১৮ ০৬:০০ অপরাহ্ন
Ads

:: ড.কাজী এরতেজা হাসান ::
  
সুষ্ঠু, ফেয়ার ইলেকশন হবে কি হবে না এই প্রশ্নটি বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনই হোক আর স্থানীয় নির্বাচনই হোক সবসময়ই জড়িয়ে থাকে। এবারও এর ব্যতিক্রম দেখা দেয়নি। এখনো এই প্রশ্নটি নিয়ে ঘুরপাক খাচ্ছে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। তবে এবার আর আগের বারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনগুলোর মতো এতোটা প্রকট রূপে দেখা  দেয়নি- সুষ্ঠু নির্বাচন হবে কি-না এ প্রশ্নটি কেন্দ্র করে। জাতীয় ঐক্য ফ্রন্টের সাথে ক্ষমতাসীন দলের প্রথম সংলাপেই প্রধানমন্ত্রী আশ্বাস দিয়ে বলেছেন তার ওপর সবাইকে ‘বিশ^াস’ রাখতে। তিনি সুষ্ঠু নির্বাচন দিবেন। সুখের বিষয় প্রধানমন্ত্রীর এই ‘মৌখিক আশ্বাসে’ শতভাগ আশ^স্ত না হলেও গেলবারের মতো আর গো ধরে বসে থাকেনি ড. কামাল হোসেন নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্ট বা বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট। অর্থাৎ আর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে অনড় নয়, প্রধানমন্ত্রীর মৌখিক আশ্বাসেই তারা নির্বাচনে এসেছে। যদিও এখনো সুষ্ঠু নির্বাচন, সমতল মাঠ ইত্যাদি নিয়ে প্রশ্ন তুলে যাচ্ছে যথারীতি।    

এর ওপরই সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজের (সিজিএস) উদ্যোগে আয়োজিত ‘ভোটের রাজনীতি ও জনগণের ভোটের অধিকার’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা বলেছেন, দেশের মানুষ একটি অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চায়। জনপ্রত্যাশা অনুযায়ী সুষ্ঠু নির্বাচন করা ইসির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ, তা বলাই বাহুল্য।

আমরা দেখেছি যে, এর আগের বারের ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচন যে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল সেই অভিজ্ঞতার নিরিখেই বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হতে যাচ্ছে তাতে করে স্বাভাবিকভাবেই ভোটারদের মধ্যে এবারও এক ধরনের উদ্বেগ তৈরি থাকতে পারে। যদিও এবার অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে, আর এ নিয়ে বাংলাদেশে বিদেশি কূটনৈতিকরাও খুশি তদুপরি এ নির্বাচন কতোটা প্রতিযোগিতামূলক হবে, কিংবা ভোটের ফলাফলে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন কতোটা ঘটবে, সার্বিক বিচারে এ নিয়ে জনমন এখনো পূর্ণমাত্রায় প্রস্তুত নয়।

তবে আমরা আশাবাদী হতে চাই এ কারণে যে, প্রধানমন্ত্রী ইতিপূর্বে একাধিকবার সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হবে বলে প্রত্যয় প্রকাশ করেছেন। বলার অপেক্ষা রাখে না, নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে শুধু নির্বাচন কমিশন নয়; একইসঙ্গে রাজনৈতিক দল, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ অন্যান্য অংশীজনের নির্মোহ ও নিরপেক্ষ ভূমিকা থাকতে হবে। রাজনৈতিক দলসহ অপরাপর অংশীজনের ইতিবাচক ভূমিকা ও অংশগ্রহণ ছাড়া নির্বাচন পূর্ণতা পাবে না। আর এটিই হচ্ছে বড় চ্যালেঞ্জ। এখন দেখার বিষয় এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জাতি কতোটা সক্ষম কি অক্ষম। যদি এবারও এখানে  সেই চিরাচরিত অক্ষমতার প্রকাশ দেখা দেয়, তাহলে আমাদের সব ভাল অর্জনই তখন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে। 
রাজনৈতিকভাবে অসহিষ্ণু এ দেশটিতে নির্বাচন, বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশে সহিংস পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে কেবল সাধারণ মানুষ নিরাপত্তা ও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে না; অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে আমদানি-রফতানি কার্যক্রম এবং দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগসহ সরকারের রাজস্ব আয়ের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিরূপ প্রভাব পড়বে শেয়ার বাজারেও; এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন বিনিয়োগকারীরা।

তাছাড়া সহিংস রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিভিন্ন উৎপাদনশীল খাত ও রফতানিমুখী শিল্প ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে পড়লে এসব শিল্পের ওপর নির্ভরশীল হাজার হাজার শ্রমিকের ভাগ্যও হয়ে পড়বে অনিশ্চিত। সবচেয়ে বড় কথা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আমরা সক্ষম না হলে বিনিয়োগ ও উন্নয়নে কাক্সিক্ষত সাফল্য আসবে না। কাজেই একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে এককভাবে নির্বাচন কমিশনের ওপর নির্ভর করলে হবে না। এ জন্য সাধ্যমতো আমাদেরও অনেক কিছুই করার আছে। সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থেই ‘সব দোষ, নন্দ ঘোষ’- এ স্বভাব পরিহার করতে হবে।

গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, পরমতসহিষ্ণুতা, আইনের শাসন, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ইত্যাদির অবর্তমানে আর যাইহোক, নির্বাচন কমিশনের মাত্র কয়েকজন ব্যক্তির পক্ষে সুষ্ঠু নির্বাচন দেওয়া সম্ভব নয়। এ জন্য স্বাধীন প্রশাসনিক ব্যবস্থার পাশাপাশি যোগ্য ও ন্যায়নিষ্ঠ নির্বাচন কমিশন, রুচিশীল ও পরিচ্ছন্ন মনমানসিকতার ধারক-বাহক রাজনৈতিক দল এবং সংবেদনশীল নাগরিক সমাজ যদি একই ভাবনায় মিলে যায়, সে নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হতে পারে। এখন অতীতের ক্লেদযুক্ত স্বভাব ভুলে সেই যূথবদ্ধ পরিচয় দিতে আমরা প্রস্তুত তো!

Ads
Ads