কাল থেকে নতুন সরকার: শক্তিশালী বিরোধী দলের কী হবে?

  • ১৪-জানুয়ারী-২০১৯ ১২:৩০
Ads

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী মহাজোটের ২৮৮ জন সংসদ সদস্যের শপথগ্রহণ শেষে ইতোমধ্যেই মহামান্য রাষ্ট্রপতি শেখ হাসিনাকে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। কাল সেই নতুন সরকার শপথগ্রহণ করতে যাচ্ছে। দলটির সাধারণ সম্পাদক জানিয়েছেন, এবার মন্ত্রিসভায় বড় ধরনের চমক থাকবে। এখন নতুন মন্ত্রিসভা কেমন হয় তা দেখার অপেক্ষায় রয়েছে দেশবাসী। বিগত সরকারের মন্ত্রিসভায় যারা বিতর্কিত ছিলেন কালকের মন্ত্রিসভায়ও তারা থাকছেন কি-না তাও দেখার অধীর অপেক্ষায় রয়েছে দেশবাসী।  

ভোট গ্রহণের ব্যাপারে নানা অভিযোগ সত্ত্বেও একাদশ সংসদ নির্বাচনটি অংশগ্রহণমূলক হয়েছে, এটা দেশবিদেশের নির্বাচন পর্যবেক্ষকসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা স্বীকার করে নিয়েছে। এমনকি বিএনপি-জামায়াতের চিরকালের মিত্র পাকিস্তানও বর্তমান সরকারকে স্বাগত জানিয়েছে। যদিও বাংলাদেশ সরকার ইমরান খানের সরকারকে স্বাগত জানায়নি। বিষয়টা এখানেই কৌতূহলদ্দীপক। এখন দেখা যাক, আসছে নতুন সরকারের ওপর যে দায়িত্ব অর্পিত হবে তারা কী করেন। তারা যে নিরঙ্কুশ রায় পেয়েছেন সেটার মূল্যায়ন কতটুকু করতে পারেন। কেননা, এটা স্বীকার করতেই হবে যে, গত পাঁচ বছরের শাসনামলে সুশাসনের অভাব এবং দুর্নীতি ছিল বহুল আলোচিত বিষয়। 

বলাইবাহুল্য, দেশে শক্তিশালী বিরোধীদল না থাকাতেই এ প্রশ্নে বর্তমান সরকার বিনা বাধায় উতরে যেতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু বিএনপি জোট যখন সরকারে ছিল তখন তাদের সীমাহীন দুর্নীতিকেই পুঁজি করেই আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায় ফিরতে সক্ষম হয়, যা বিএনপি পারেনি। এটা ঠিক যে, বিএনপির আমলে দেশ পরপর ৫ বার বিশে^র এক নম্বর দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ ছিল। আবার পরে কিছুটা নীচে নামলেও দুর্নীতির গুণগত পরিবর্তন কিন্তু মোটেও কমেনি। বরং ক্ষেত্রবিশেষে বেড়েছে। এই সুযোগ বিএনপি নিতে পারেনি। নিবেই বা কী করে। তারা নিজেরাই তো ছিল দুর্নীতিগ্রস্ত। সুতরাং এখানে ‘চোরের মায়ের বড় গলা’ আর হয় কী করে? ফলে নিজেদের দোষেই বিএনপি এখানেও ব্যর্থ হয়। কিন্তু বর্তমান সরকারকে মনে রাখতে হবে, বিএনপির আমলে দেশ যেমন দুর্নীতিগ্রস্ত ছিল তার থেকে দেশ তেমন কোনোই উন্নতি ঘটেনি। এটা আন্তর্জাতিক সমীক্ষাতেই প্রতিষ্ঠিত। ইতোমধ্যে বিদেশে নামে-বেনামে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে। আগে কোনো বাংলাদেশির টাকা সুইসব্যাংকে ছিল না। এখন সুইসব্যাংকেও সেই পাচারকৃত টাকা গচ্ছিত থাকছে। মালয়েশিয়া, দুবাই,  কানাডা প্রভৃতি দেশে সেকেন্ড হোম গড়ে তোলা হচ্ছে। যা আগে দেখা যায়নি। কাজেই দুর্নীতে বর্তমানে দেশ এক নম্বরে না থাকলেও দুর্নীতি যে আগের এক নম্বরে থাকার চেয়েও অনেক বেড়েছে এটা অস্বীকার করা যাবে না। কেননা, দেশের প্রায় প্রতিটি এলাকায় সরকার দলীয় নেতাকর্মীদের একটি অংশ অপতৎপরতায় লিপ্ত ছিল। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজির অভিযোগও ছিল। এখন নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের এসব বিষয়েও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে হবে। 

বলাই বাহুল্য, এবারও সংসদকে শক্তিশালী বিরোধী দলবিহীন থাকতে হচ্ছে। যা গণতন্ত্রের প্রধান শত্রু। কোনো সংসদে যদি শক্তিশালী বিরোধী দল না থাকে তখন সে দেশ থেকে গণতন্ত্রের কবর রচনা হয়। বিএনপি জোট সরকারের সময় শক্তিশালী বিরোধী দল (আওয়ামী জোট) ছিল বলেই বিএনপির দুর্নীতি আর বাড়ার সুযোগ পায়নি। বরং তাদের পতন হয়েছে। যদি তখন আওয়ামী লীগ শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে সংসদে না থাকতো তাহলে আজ দেশ চরম দুর্নীতিতে ছেয়ে যেতো। প্রকৃত সত্য হচ্ছে, শক্তিশালী বিরোধী দল না থাকলে সংসদে সরকারের জবাবদিহিতার দায় প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয় না। তা ছাড়া বিদ্যমান বাস্তবতায় গণতন্ত্র চর্চার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটিগুলোও সত্যিকার অর্থে কার্যকর হতে পারে না। পরিণত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সাধারণত বিভিন্ন সংসদীয় কমিটির প্রধান হিসেবে থাকেন বিরোধী দলের সদস্যরা। তাতে সরকারের সব কাজ বিরোধী দলের অনুমোদনের মুখাপেক্ষী থাকে। কিন্তু গত দশ বছরের প্রথম পাঁচ বছর বিএনপি প্রধান বিরোধী দল হয়েও সংসদীয় কার্যক্রমে বিশেষ অংশগ্রহণ করেনি। ২০১৪-তে তারা নির্বাচনেই অংশ নেয়নি। এবারের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলেও তাদের নির্বাচিত সংসদ সদস্যের সংখ্যা অত্যন্ত কম, আবার এরা শপথও নেননি। নিয়মানুযায়ী ৯০ দিনের পদ তাদের পদ বিলুপ্ত হয়ে পড়বে। এর মধ্য দিয়ে যথাযথ পদ্ধতিতে সংসদীয় কমিটি গঠনও অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তবে ইতোমধ্যে গণফোরাম তাদের দুসদস্য শপথ নেবে বলে আভাস দিয়েছে। এখন আমাদের বিশ^াস গণফোরামের মতো বিএনপিও ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিবে। নয়তো তারা নিজেরাই নিজেদের ‘কবর’ রচনা করবে। যেটা আওয়ামী লীগের নেতা মোহাম্মদ নাসিম বলেছিলেন। যে, ডিসেম্বরের ৩০ তারিখের পর বিএনপিকে তারা ‘কবর’ দিবে। সেই ‘কবর’ দেওয়ার পরিকল্পনাটি কি এমন সাজানোই ছিল কি-না, সেটা তারাই বলবেন, তবে সেই উক্তিটির বাস্তবায়ন করে বিএনপিই মোহাম্মদ নাসিমদের জন্য সহজ করে দিবে কি-না সেটাই দেখার বিষয়।

সর্বোপরি বলতে চাই, শক্তিশালী বিরোধী দলবিহীন সরকারের ওপর অর্পিত গুরু দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা নিঃসন্দেহে কঠিন এবং চ্যালেঞ্জের।  সে বিচারে তো এবারের সংসদে বিরোধী দলের অবস্থা একেবারেই হাস্যকর অবস্থায় রয়েছে। অনেকের রাজনীতিক ইমেজই নেই। এ অবস্থায় তাই নতুন সংসদকে কার্যকর একটি প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে হলে সরকারি দলকেই পুরো দায়িত্ব নিতে হবে। যেমন বিগত দশম সংসদেও এই একই দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হয়েছে। আর তার প্রায় সবই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেই সামলাতে হয়েছে। কিন্তু এখন শেখ হাসিনার বয়স হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নিজেই বলেছেন, এবারই শেষ। আর তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে থাকছেন না। কিন্তু তার বিকল্প হিসেবে এর জন্য তো আগাম প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে। আর এটাই ঝালিয়ে দেখার জন্য শক্তিশালী বিরোধী দলেরও কোনো বিকল্প নেই। যেমন, গতকাল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘রাজনীতিক হিসেবে ফখরুল ব্যর্থ’। এই ব্যর্থতা কেন হলো? একটি শক্তিশালী ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে তিনি পেরে ওঠেননি বলেই তো। কাজেই আওয়ামী লীগে আগামী দিনে শক্তিশালী নেতৃত্ব দিবে,  শেখ হাসিনার মতো তেমন শক্তিশালী নেতা কীভাবে হবে, যদি শক্তিশালী বিরোধীদলই না থাকে? 

Ads
Ads